সিপিডির প্রতিবেদন
ই-গভর্নেন্সের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না প্রান্তিক জনগোষ্ঠী

গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশের লক্ষ্যে আজ সোমবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলের লা ভিটা হলে আয়োজন করা সংলাপের। ছবি : আগামীর সময়
দেশে ডিজিটাল সেবা বা ই-গভর্নেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও অবকাঠামোগত ঘাটতি, দক্ষতা ও সচেতনতার অভাবে এর কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নারী, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। সরকারি ই-সেবার বহু ক্যাটাগরি তৈরি করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও অধিকাংশ সেবাই অনলাইনে পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পন্ন করা যায় না, যার ফলে সেবা পেতে নাগরিকদের শেষ পর্যন্ত সশরীরে সরকারি দপ্তরেই যেতে হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘ইস্টাবলিশিং ইফেক্টিভ অ্যান্ড অ্যাকাউন্টাবল ই-গভর্নেন্স টু স্ট্রেন্থেন লোকাল গভর্মেন্ট ইন্সটিটিউশনস’ শীর্ষক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।
গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশের লক্ষ্যে আজ সোমবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলের লা ভিটা হলে আয়োজন করা সংলাপের। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
ইউএসআইডি, সুইজারল্যান্ড, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় পরিচালিত এই গবেষণার জন্য ২ হাজার ৬১১ জন নাগরিক এবং ২৯৭টি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি দপ্তরের ওপর তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণা প্রতিবেদনের বলা হয়েছে, কাগজে-কলমে সেবাগুলো ডিজিটাল বলা হলেও বাস্তবে নাগরিকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের মধ্যে মাত্র এক দশমিক আট শতাংশ এবং তরুণদের মাত্র দুই দশমিক নয় শতাংশ সম্পূর্ণ অনলাইন প্রক্রিয়ায় সেবা শেষ করতে পেরেছেন।
অন্যদিকে প্রায় ৩৭ শতাংশ নারী ও তরুণ জানিয়েছেন, অনলাইনে আবেদন করার পর বাকি প্রসেসের জন্য তাদের কাগজপত্র জমা দিতে ও সশরীরে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে।
সেবা নিতে গিয়ে অর্ধেকেরও বেশি মানুষকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে কাগজ জমা ও সংগ্রহ করতে হয়েছে। আর প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ মানুষকে অফলাইনে ফি পরিশোধ কিংবা স্বাক্ষর করতে হয়েছে। এমনকি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন অনেক নাগরিক।
ডিজিটাল সেবার প্রসারে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব ও ইন্টারনেট বিভ্রাট।
জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক নাগরিকেরই ডিজিটাল স্বাক্ষরতার ঘাটতি রয়েছে। অধিকাংশ পরিবারে মৌলিক কম্পিউটার ব্যবহারের ন্যূনতম যোগ্যতা নেই। এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও নাগরিকদের বড় একটি অংশ শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বিশেষ করে নারীদের একটি বড় অংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তথ্য হ্যাক হওয়া বা সহকর্মীদের মাধ্যমে তথ্যের অপব্যবহারের আশঙ্কা করেন।
প্রতিবেদনে সরকারি দপ্তরগুলোর অবকাঠামোগত করুণ চিত্রও সামনে এসেছে। ১০০ স্কোরের মধ্যে সার্বিক প্রস্তুতি সূচকে স্থানীয় সরকার দপ্তরগুলো পেয়েছে মাত্র ৩৮ দশমিক ৯।
মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন অফিসে কম্পিউটার অকেজো হয়ে পড়ে আছে। অধিকাংশ দপ্তরেই জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা নেই।
এছাড়া ই-গভর্নেন্সের প্রস্তুতিতে তীব্র আঞ্চলিক বৈষম্য দেখা গেছে। যেখানে ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও রংপুর বিভাগের পারফরম্যান্স সবচাইতে নিচে। সেবা পেতে সমস্যা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ প্রক্রিয়ার অজ্ঞতার কারণে অধিকাংশ নাগরিক কোনো অভিযোগ দায়ের করেন না।
পরিস্থিতি উত্তরণে সিপিডি বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটি মনে করে, প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজনকে সরকারি ই-সেবা ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে ‘ওয়ান ডিজিটাল মেম্বার পার হাউসহোল্ড’ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এছাড়া কেবল আবেদনপ্রক্রিয়া নয়, বরং পুরো সেবাকে পুরোপুরি অনলাইনমুখী করা, তৃণমূলের সরকারি দপ্তরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করা এবং তথ্যের নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি।
একইসঙ্গে নাগরিক ভোগান্তি কমাতে সহজ অভিযোগ ব্যবস্থা চালু ও সেবা পাওয়ার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দৃশ্যমান স্থানে টাঙিয়ে রাখার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন আইসোশ্যালের চেয়ারম্যান ড. অনন্য রায়হান, পাবলিক ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্টের এমআইএস বিশেষজ্ঞ আমিনুল মহাইমেন, এটুআইয়ের সিনিয়র কনসালটেন্ট ফজলুল জাহেদ পাভেল, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ নূর উল্লাহ এবং সাভার উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান।







