রুনা খানের ফ্রেন্ডশিপ কী করছে, যা এনে দিল বড় স্বীকৃতি

রুনা খান। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
প্রান্তিক মানুষের জীবনে সুদিনের স্বপ্ন লালন করে বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ। চিকিৎসা বঞ্চিত মানুষের দুয়ারে সেবা পৌঁছে দেওয়া, অভাবের সংসারে আলো জ্বালানো থেকে শুরু করে খাবার নিয়ে তারা ছুটে যায় বন্যা দুর্গতদের ঘরে। শিক্ষার সুযোগ না পাওয়াদের কাছে জ্ঞানের মশাল পৌঁছে দেওয়ার কাজও করছে এ সংস্থা। এই কাজ চলছে ২০০২ সালের পর থেকেই।
নিরবচ্ছিন্নভাবে এসব কার্যক্রমের নেতৃত্বে রয়েছেন সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান। যাকে ম্যাগসাইসাই পুরস্কারে ভূষিত করেছে র্যামন ম্যাগসাইসাই ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, অন্যের সেবায় নিয়োজিত থাকা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা এবং মানুষকে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করায় দেওয়া হয়েছে এই পুরস্কার।
সংস্থাটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, ভাসমান হাসপাতাল ও সকলের জন্য স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, দুর্যোগে ত্রাণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীলতা, শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তি ও অধিকার এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করে ফ্রেন্ডশিপ।
তারা জানিয়েছে, ৭৫ লাখ মানুষ ফ্রেন্ডশিপের স্বাস্থ্য পরিষেবার আওতায় রয়েছে। জরুরি খাদ্য সহায়তা পেয়েছে ৮৩ লাখ মানুষ। প্রতি বছর সংস্থাটির অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিকত্ব সচেতনতা কর্মসূচি থেকে উপকৃত হয় ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ।
ফ্রেন্ডশিপের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে উপকৃত মানুষের সংখ্যা ৯৮ হাজার। উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকায় সংস্থাটির ৬টি পানি শোধনাগার থেকে নিরাপদ পানি পেয়ে থাকেন ৮০ হাজার মানুষ। শিক্ষা কার্যক্রম থেকে উপকৃত শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কের সংখ্যা ২৫ হাজার।
স্বাস্থ্যসেবায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করে সংস্থাটি। তাদের দুটি ভাসমান হাসপাতাল ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলে এবং একটি স্থলভিত্তিক হাসপাতাল রয়েছে উপকূলীয় অঞ্চলের শ্যামনগরে। এসব হাসপাতালে চোখের ছানি, ক্লাবফুট মতো সমস্যার চিকিৎসা করা হয়। এছাড়া পুড়ে যাওয়া রোগীদের চিকিৎসায় আরও জটিল অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি শিশু, স্ত্রীরোগ, দন্ত ও চক্ষুসেবা দেওয়া হয়। এসব হাসপাতালে বিনামূল্যে ও সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা পান রোগীরা।
ফ্রেন্ডশিপের ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা দল রয়েছে যারা সাপ্তাহিক, পাক্ষিক বা মাসিক ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে। দুর্যোগের সময় বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর কাছেও স্যাটেলাইট ক্লিনিকের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেন তারা। স্থানীয় কমিউনিটির নারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত করে সংস্থাটি। এ কাজে একটি মোবাইল অ্যাপও রয়েছে তাদের।
ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার সময় মানুষকে আশ্রয় দিতে দক্ষিণাঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করেছে ফ্রেন্ডশিপ। স্বাভাবিক সময়ে স্থাপনাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উত্তরের নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে বন্যার পানি থেকে মানুষ ও তাদের গবাদিপশুকে রক্ষায় উঁচু প্লিন্থ বা বন্যার পানির স্তরের চেয়ে উচু ক্ষুদ্র গ্রাম তৈরি করা হয়েছে। দুর্যোগের সময় ফ্রেন্ডশিপ দুর্গম জনগোষ্ঠীর কাছে জরুরি ত্রাণসেবা পৌঁছে দেয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপদ পানির চাহিদা মেটাতে ছয়টি পানি শোধনাগার স্থাপন করেছে ফ্রেন্ডশিপ। সাশ্রয়ী মূল্যে এগুলো থেকে পানি সরবরাহ করা হয়।
কোভিড-১৯ মহামারিতে আয় হারানো অতিদরিদ্র পরিবারের জন্য কুড়িগ্রামে ফ্রেন্ডশিপ একটি খাদ্যব্যাংক চালু করে। এর মাধ্যমে স্বচ্ছল পরিবারগুলোকে চাল, আলু, ডালসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়।
দারিদ্র বিমোচনেও কাজ করে ফ্রেন্ডশিপ। ফ্রেন্ডশিপের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে নারীদের তাঁত বোনা, কাপড়ে রং করা ও সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে এসব পণ্য বাংলাদেশ ও ইউরোপে ফ্রেন্ডশিপের লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ‘কালার্স অব দ্য চার্স’-এর মাধ্যমে বিক্রি করা হয়।
সংস্থাটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, জীবিকা রক্ষা বা নতুন জীবিকার সুযোগ তৈরিতে কৃষক ও জেলেদের ঋণ দেয় ফ্রেন্ডশিপ। সেইসঙ্গে তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, উৎপাদন বাড়ানো এবং সামগ্রিকভাবে আর্থিকভাবে টেকসই হয়ে ওঠার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া বিদ্যমান উপকারভোগীদেরও দেওয়া হয় ক্ষুদ্রঋণ।
বাংলাদেশ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী, কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং অতিদরিদ্র ও ভূমিহীন পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট জমির ব্যবস্থা রয়েছে। জরুরি সহায়তা প্রয়োজন এমন পরিবারগুলোর জন্য এসব কর্মসূচি ও সুযোগ রাখা হয়। এসব সেবা সম্পর্কে প্রান্তিক অনেক মানুষ অবগতই নয়। ফ্রেন্ডশিপের কমিউনিটি কর্মীরা দুর্গম এলাকার মানুষকে সরকারি সেবার সুযোগ পেতে সহায়তা করেন। এছাড়া হারিয়ে যেতে বসা কারুশিল্পের কর্মীদের টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে কাজ করছে ফ্রেন্ডশিপ।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে কাজ করে ফ্রেন্ডশিপ। নদীর চর ও কাদামাটিতে ম্যানগ্রোভ গাছ লাগিয়ে জীববৈচিত্র্য রক্ষা, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙন ঠেকানো এবং লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ রোধে কাজ করে সংস্থাটি। সরকারি ও অন্যান্য বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে মিলে দেশের জলবায়ু ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভবন নির্মাণে কাজ করছে তারা।
দুর্গম চরাঞ্চলের পরিবারগুলোকে কম খরচে সৌরবিদ্যুৎচালিত আলো এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে সৌরবিদ্যুৎচালিত সড়কবাতির সুবিধা দিচ্ছে ফ্রেন্ডশিপ। তিনটি নতুন সৌর মাইক্রোগ্রিড স্থাপন করে ৫৬০টি পরিবারকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় নিয়ে এসেছে সংস্থাটি।
প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বয়স্কদের জন্যও শিক্ষা সেবা পৌঁছে দেয় ফ্রেন্ডশিপ। সংস্থাটি স্থানীয় জনগোষ্ঠী থেকে কর্মী নিয়োগ করে বলে জানিয়েছে। মেডিক-এইড, শিক্ষক, প্যারালিগ্যাল, দক্ষ প্রসব সহকারী, সৌর প্রযুক্তিবিদ ও প্যারা-ভেটসহ প্রায় ৫ হাজার কর্মী রয়েছে তাদের। এছাড়া আইনি সহায়তা ও অধিকার বিষয়ে সচেতনতা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নেও কাজ করে সংস্থাটি।
র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় রুনা খান বলেছেন, অত্যন্ত আনন্দ ও গভীর বিনয়ের সঙ্গে আমি র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার গ্রহণ করছি। এটি আমার জন্য পরম সম্মানের। পুরস্কারটি আমি সেইসব সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে গ্রহণ করছি, যারা আমাদের তাদের পাশে চলার সুযোগ করে দেন। একই সঙ্গে আমার ফ্রেন্ডশিপ পরিবারের পক্ষ থেকেও এটি গ্রহণ করছি, যাদের অক্লান্ত নিষ্ঠা প্রতিদিন এই কাজকে সম্ভব করে তোলে।
তিনি আরও বলেছেন, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে আমার ওপর আস্থা রেখেছেন এবং বিশ্বাস করে আমার সঙ্গে প্রায় অসম্ভব এই পথ চলেছেন, তাদেরও ধন্যবাদ জানাই।











