ব্যবসায়ীদের অভিযোগ
চাঁদাবাজি ও কারসাজিতে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

সংগৃহীত ছবি
সড়কে চাঁদাবাজি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং অসাধু চক্রের কারসাজির কারণে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন বাজার ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তারা জানান, বাজারে কার্যকর ও নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা গেলে আসন্ন রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি ও সংকটের কথা তুলে ধরেন।
সভায় কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও সড়কে চাঁদাবাজির কারণে ৩০ টাকার সবজি ভোক্তাকে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।’
শ্যামবাজার কৃষিপণ্য আড়ৎ মালিক সমিতির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন অভিযোগ করেন, মুনাফাখোর কিছু ব্যবসায়ীর জন্য সবাইকে অপবাদ শুনতে হয়। তিনি জানান, ‘মিনিকেট’ নামে কোনো ধানের জাত না থাকলেও করপোরেট ব্যবসায়ীরা ৫০ টাকার চাল প্যাকেটজাত করে ৭০ টাকায় বিক্রি করছেন। এছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীরা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা নিয়ে যাচ্ছে এবং শ্যামবাজারে পুলিশও চাঁদা তুলছে।
আইনশৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা তুলে ধরে খিলগাঁও (তালতলা) সিটি করপোরেশন সুপারমার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব কাজী আনিসুজ্জামান বলেছেন, ‘নজরদারি বাড়ানো হলে ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে ব্যবসা করতে পারতেন।’
ফকিরেরপুল বাজার সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির শওকত হোসেন জানান, প্রতিটি বাজারেই ‘কন্ট্রোলার’ রয়েছে এবং সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে ক্ষমতাসীনদের লোকজন বাজার নিয়ন্ত্রণে নেন।
একই সুরে বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বললেন, ‘মনিটরিংয়ের অভাবেই এক রাতের ব্যবধানে ৫০ টাকার পণ্য ৭০ টাকা হয়ে যায়; এই অদৃশ্য সিন্ডিকেটের প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে ভোক্তার পকেটে।’
বাজারের সাম্প্রতিক চিত্র তুলে ধরে পালস অ্যান্ড ল্যান্টিল ক্রাশিং মিল মালিক সমিতির বিকাশ চন্দ্র সাহা জানান, ১০ দিনের ব্যবধানে ডাবরি ও ছোলার দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। সিটি গ্রুপ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় কেউ কেউ বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন।
রুটি-বিস্কুট প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘কাঁচামালের দাম বাড়ায় গত তিন মাসে ২০টি কারখানা বন্ধ হয়ে প্রায় ১ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে রুটি-বিস্কুটের দাম ২০ শতাংশ বাড়তে পারে।’
স্থানীয় পর্যায়ের চাঁদাবাজির উদাহরণ দিয়ে নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের পরিচালক সোহেল আক্তার বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের একটি বাজারে প্রতিদিন চৌকি (খাট) ভাড়া বাবদ ৩ হাজার টাকা দিতে হয়, যা ব্যবসায়ীরা ভোক্তার কাছ থেকেই তুলে নেন।’
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা সতর্ক করে বললেন, ‘নানা সংকটে বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে বাজার এখন হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে গেছে; বন্ধ কারখানাগুলো চালু করা না গেলে ভোজ্যতেল ও চিনির সংকট তীব্র হবে।’
তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে মেঘনা গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপ-মহাব্যবস্থাপনা পরিচালক তসলিম শাহরিয়ার জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বাড়লেও বর্তমানে দেশে মিলগেটে চিনির দাম স্থিতিশীল রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের পর এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. ফজলুল হক জানান, লোক দেখানো বাজার মনিটরিং না করে ব্যবসায়ীদের সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং সামনের রমজানে পণ্যের বাড়তি চাপ সামলাতে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হবে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অক্টোবর মাসে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে ব্যবসায়ীদের নিয়ে আবার বসা হবে।’
অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য পরামর্শক (যুগ্ম নিয়ন্ত্রক) আবু সালেহ্ মোহাম্মাদ ইমরান গণমাধ্যমে পণ্যমূল্য নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্ক তৈরি না করার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এছাড়া সরবরাহ ও চাহিদার তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আগাম বাজার পরিস্থিতি পূর্বাভাস করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।









