তারেক রহমানের বেইজিং সফর, সম্পর্কোন্নয়নের যত চ্যালেঞ্জ

চীনের দালিয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান। ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরের দ্বিতীয় গন্তব্য হিসেবে চীনকে বেছে নিয়েছেন। সফরটি ঘিরে দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক আগ্রহ ও উচ্চপ্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, এই ঐতিহাসিক সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৫টির বেশি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে, যার মধ্যে বড় ধরনের অবকাঠামো ও শিল্প প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশ ও চীন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দুই দেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচ নীতির ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই অংশীদারত্ব বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ২০২৪ সালে এই সম্পর্ককে ‘ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে’ রূপান্তর করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীন টানা ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। পাশাপাশি, বেইজিং চীনে রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করেছে। অবকাঠামো উন্নয়নে পদ্মা সেতুর মতো যুগান্তকারী প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
এছাড়া আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানেও দুই দেশ একযোগে কাজ করছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় এই সহযোগিতা আঞ্চলিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
তবে এই ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে কিছু পরাশক্তি বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
এমনকি চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার প্রকল্পগুলোকে বাধাগ্রস্ত করতে ‘ঋণফাঁদ’-এর মতো নেতিবাচক প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিমালার ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের একটি উচ্চপদস্থ ও বুদ্ধিজীবী মহল এখনো পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের মাধ্যমে গভীরভাবে প্রভাবিত। তারা প্রায়ই চীনের উন্নয়ন রূপরেখা গ্রহণে পশ্চিমা বিশ্বের অসন্তুষ্টির আশঙ্কা করেন।
এছাড়া বাণিজ্য ঘাটতির জন্য কেবল ‘চীনা পণ্যের আধিক্যকে’ দায়ী করা হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের সীমিত বৈচিত্র্য ও সক্ষমতার মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো অনেক সময় আলোচনায় আসে না।
এই প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে উভয় পক্ষের আরও প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে, দৃষ্টিভঙ্গির এই দূরত্ব ঘোচাতে নীতিনির্ধারকদের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক সাহসিকতা দেখাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর চীনের সঙ্গে সহযোগিতার প্রতি ঢাকার প্রতিশ্রুতি কতটা দৃঢ়, তা বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট করবে।
সফরের অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো শিল্প খাতে সহযোগিতা আরও জোরদার করা। চীন তার দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তুলতে উৎসাহিত করছে, যাতে স্থানীয় শ্রম-ব্যয়ের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানির জন্য উচ্চ-মূল্যসংযোজিত পণ্য তৈরি করা যায়।
এছাড়া গ্লোবাল সাউথ এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এশিয়ার শিল্প খাতের সঙ্গে আরও নিবিঢ়ভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ‘চীন-দক্ষিণ এশিয়া এক্সপো’ ও ‘চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা ফোরাম’ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মোটা দাগে বলা যায়, দুই দেশই রাষ্ট্র পরিচালনাবিষয়ক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে বাংলাদেশ তার নিজস্ব পরিস্থিতির উপযোগী উন্নয়নের পথ খুঁজে পেতে পারে। রাজনৈতিক দল এবং স্থানীয় সরকারগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
উন্নয়নের কোনো একক ধরাবাঁধা নিয়ম নেই; প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একটি আধুনিকায়নের পথ বেছে নেওয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে।
চায়না গ্লোবাল টাইমসের অবলম্বনে...





