দলীয় ছত্রছায়া আর পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় অপরাধ
- তৃণমূলের নেতারা জড়াচ্ছেন অপকর্মে
- রাজনীতিতে ছড়াচ্ছে উত্তাপ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দখল-দাপট-চাঁদাবাজির অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় দেশ। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়াচ্ছে উত্তাপ। নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দিয়েছে মানুষের মধ্যে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বেশ নাজুক। ব্যঙ্গাত্মক কর্মসূচিও দিচ্ছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। সব মিলিয়ে কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে সরকার। বিশ্লেষকদের অভিমত, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ‘অপরাধমূলক’ ঘটনাগুলো ঘটায়, সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না এই সংকটজনক পরিস্থিতি। তারা বিষয়টিকে সরকারের জন্য অশনিসংকেত উল্লেখ করে যত শিগগির সম্ভব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বলছেন। পাশাপাশি ২০০২ সালের অপারেশন ক্লিন হার্ট অভিযানের আদলে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যায় কি না, সে কথাও বলছেন কেউ কেউ।
গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলছিলেন, ‘দেশের সব জায়গায় মানুষের নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি এমন, যেন অত্যাচারের উৎসব লেগেছে। অথচ বড় একটি গণঅভ্যুত্থানের পর এমন পরিস্থিতি হওয়ার কথা ছিল না।’
অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম গতকাল বাংলা মোটরে দলীয় অফিসে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ ঠিক নেই। সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বরং প্রশাসনের সহযোগিতায় সারা দেশে দখল-বাণিজ্য চলছে।’ তার দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এরই মধ্যে ব্যর্থ হয়েছেন। তাকে (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) দায়িত্বে রেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়।
যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বরাবরই বলে আসছেন, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক। আগের চেয়ে তুলনামূলক ভালো বলেও দাবি করেছেন তিনি। বলেছেন, ঢালাওভাবে আইনশৃঙ্খলা অবনতির কথা বলা মোটেও উচিত নয়।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্স আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘গত কয়েক দিনে ঢাকায় ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এসব ঘটনায় আমরা ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা এবং নির্লিপ্ততায় আমরা বিব্রত।’
তবে এসব ঘটনার সঙ্গে বিএনপি কোনোভাবেই জড়িত নয় দাবি করে বিএনপির এই যুগ্ম মহাসচিবের ভাষ্য, জড়িতদের কঠোর আইনের আওতায় নিয়ে আসতে তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানালেন, এজন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রশাসনও পদক্ষেপ নিচ্ছে। নিরপেক্ষ তদন্তের মধ্য দিয়ে জড়িত যাদের নামই বেরিয়ে আসুক, সে যে দলের বা যত ক্ষমতাবানই হোক, তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
একই সঙ্গে এমন ঘটনা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের সক্রিয় নজরদারির আহ্বানও জানালেন এমরান সালেহ প্রিন্স।
গত কয়েক দিনে রাজধানীতে ঘটে যাওয়া অন্তত চারটি ঘটনা দখল-দাপট-চাঁদাবাজির আলোচনাকে টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত করে। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে দল বেঁেধ মিরপুরে ‘গরিবের হাসপাতাল’ হিসেবে পরিচিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে জায়গা দখলে নেয় একটি পক্ষ। ওই ঘটনায় সরকারি দলের স্থানীয় নেতাকর্মী থেকে শুরু করে এক নারী সংসদ সদস্যের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এরপর শনিবার রাত ১১টার দিকে ইসিবি চত্বরে নিউগিনি প্রপার্টিজের দখল-পাল্টা দখলের জেরে হামলা, ভাঙচুর চালানো হয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে। পিকআপ ভ্যানে আসা হামলাকারীরা গুলিও ছোড়ে। এ ঘটনায় শুরুতে সালমান বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুললেও পরে তার অবস্থান পরিবর্তন করেন। এর আগে শনিবার বেলা ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যানে ১৭ কাঠা জমি দখল ঘিরে চলে সশস্ত্র হামলা-ভাঙচুর। একই দিন সকাল সাড়ে ৬টায় আদাবর শ্যামলী হাউজিংয়ে আটতলা বাড়ি দখলের চেষ্টায় রামদা, চাপাতি, পিস্তলসহ প্রায় ২০ জনের একটি দল হামলা চালায়। গা শিউরে ওঠা ওই ঘটনার দৃশ্য ধরা পড়ে ক্লোজ সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরায়। পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। পুলিশের সামনে মিরপুরের ঘটনা ঘটলেও হামলা ও লুটপাটে অংশ নেওয়া কারও বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা িনতে দেখা যায়নি। আদাবরের ঘটনাও ঘটে থানার অদূরেই। তারপরও পুলিশ খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে যায়নি। ফলে সামনে আসে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টি।
যদিও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ আগামীর সময়ের কাছে দাবি করেছেন, সক্রিয়ভাবেই পুলিশ সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো ঘটনায় কারও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠামাত্রই তা খতিয়ে দেখে নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা। পুলিশের অবস্থান সব সময় স্পষ্ট। কোনো দল বা মত দেখা হবে না, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে। কোনো ধরনের দখল, বেআইনি বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কেউ করতে পারবে না। যারা এসব করবে, তাদেরই আইনের আওতায় আনা হবে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দেশের প্রতিটি থানার অপারেশন অফিসারের (ওসি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের। তারা ওসিদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে আসামি ধরানো কিংবা ছাড়ানোর নামে ‘বাণিজ্য’ করে আসছেন। ফলে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ঘটানো দখল-দাপট-চাঁদাবাজির ঘটনায় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে পুলিশ। এক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও আছে। ফলে সারা দেশে এমন ঘটনার বিস্তার লাভ করছে দ্রুত। এসব ঘটনার দায় সরকারের কাঁধে চাপলেও পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহল বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নেওয়া হচ্ছে না কার্যকর কোনো ব্যবস্থা। উল্টো ঘটনা ঘটলেই জড়িত ‘চুনোপুঁটিদের’ গ্রেপ্তার করে তা বিচ্ছিন্ন বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে অভিযুক্তরা দ্বিগুণ উৎসাহে ঝুঁকছে অপরাধে।
শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিনিয়ত জমি দখল-সংক্রান্ত সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। গত শনিবার সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় জমির বিরোধ থেকে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৫ জন। আগের দিন শুক্রবার নাটোরের সিংড়া উপজেলায় ঈদগাহ মাঠের জমি দখলকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। রবিবার দুপুরে হবিগঞ্জের বাহুবল বাজারের পুরাতন হাসপাতাল সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক স্ট্যান্ড দখল এবং আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুপক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হন। শুক্রবার কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে জলমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উপজেলা বিএনপির দুই গ্রুপের ভয়াবহ সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে পুলিশ ছিল একেবারেই অসহায়। তখন পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের ওপর হরহামেশা হামলার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান সরকারের সাত মাসেও পুলিশ আগের মতো কঠোর হয়ে দায়িত্ব পালন করছে না। এর পেছনে পুলিশের কমান্ড সংকট, বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্তি, গ্রুপিং-ট্যাগিংকে দায়ী করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে পুলিশের গা-ছাড়া ভাব রয়েছে। আবার অনেকের সঙ্গে পলাতক আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতাকর্মীদের যোগসাজশের অভিযোগও আছে।
এদিকে, চাঁদাবাজির বিকল্প উদ্যোগ হিসেবে রাজধানীর বাংলা মোটরে ‘পুনর্বাসন দানবাক্স’ স্থাপন ও গণভিক্ষা কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন সংসদ সদস্য এবং এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। গতকাল সোমবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টের মাধ্যমে তিনি এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ লেখেন, ‘১৭ বছর ধরে সরকারদলীয় অনাহারী নেতাকর্মীদের জন্য এবার গণভিক্ষা কর্মসূচি! ভিক্ষা দিন— আপনার ১ টাকাই হয়তো একজনকে চাঁদাবাজির পথ থেকে দূরে রাখবে।’
কর্মসূচির উদ্দেশ্য তুলে ধরে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, দান করুন, চাঁদাবাজি বন্ধ করুন; ১৭ বছরের অভুক্ত চাঁদাবাজদের জাতীয় পুনর্বাসনে আপনিও অংশ নিন।
জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরকারের জন্য অশনিসংকেত। এসব ঘটনায় জবাবদিহিসহ দলের আত্মশুদ্ধি অভিযান দরকার।’
অতিসম্প্রতি ঢাকার কয়েকটি ঘটনা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; বরং সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য অশনিসংকেত। এসব ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’



