শিশুমৃত্যু রোধে পরিধি বাড়ছে হাসপাতালের

সংগৃহীত ছবি
বর্তমানে হামের পরিস্থিতিতে প্রতিদিন অনেক শিশুর মৃত্যু দেশের মানুষকে আচ্ছন্ন করেছে শোকে আর দাঁড় করিয়েছে বিবেকের সামনে। নানা কর্মসূচি, পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখিতে ফুটে উঠছে কিছু একটা করার আর্তি। কিছু করার চেষ্টায় সরকারও তৎপর। এ লক্ষ্যে রাজধানীর শিশু হাসপাতালের সম্প্রসারণ এবং উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে আইসিইউসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামের সংগ্রহের।
‘বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট সম্প্রসারণ-২’ নামের একটি প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪৪ কোটি টাকা। আজ মঙ্গলবার প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে। সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অনুমোদন পেলে এটি জুলাই মাস থেকে শুরু হয়ে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ।
এটির পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের আরও ১৩টি প্রকল্প উঠবে একনেকে। এগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় হবে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। খবর সংশ্লিষ্টর সূত্রের।
পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার সোমবার আগামীর সময়কে বলেছেন, শুধু বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায়ই নয়, সব সময়ের জন্য প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। ‘আমাকে বলা হয়েছে, দেশের শিশুদের চিকিৎসায় খুব বেশি সুযোগ তৈরি করা হয়নি। ফলে সারা দেশ থেকে শিশুরা ঢাকার এই হাসপাতালটিতে আসে। ফলে এর সমক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ ছাড়া আমরা যদি শিশুদের জন্য কিছু করতে চাই, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে হবে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘অনুমোদন পেলে তো আর সঙ্গে সঙ্গে সেবা দেওয়া শুরু হবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থেকে শিশুমৃত্যু রোধে প্রকল্পটি গুরুত্ব দিয়ে একনেকে উপস্থাপন করা হচ্ছে।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পের কার্যক্রমগুলো হলো বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অবকাঠামো ও বিশেষায়িত সুবিধাদি সম্প্রসারণের মাধ্যমে শিশুস্বাস্থ্যের উন্নতি। বিদ্যমান ‘সি’ ব্লকের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করে ১০০টি শয্যা ও ছয়টি কেবিনের ব্যবস্থা করা হবে। আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতির সংস্থান করে শিশু সার্জারির নতুন বিভাগ চালু করা হবে। শিশু ইউরোলজি ও কিডনি প্রতিস্থাপন বিভাগ, শিশু সার্জিক্যাল অনকোলজি বিভাগ এবং শিশু অর্থোপেডিকস সার্জারি বিভাগ যোগ করা হবে।
পাশাপাশি পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগে ক্যাথল্যাব, কার্ডিয়াক শয্যা, আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন সুবিধা সৃষ্টি এবং হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ডায়াগনস্টিক সুবিধাদি বাড়ানো হবে। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের ‘নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬’-এর আওতায় স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা’ নিশ্চিত করার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন করা হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট দেশের শিশু স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষায়িত ও টারশিয়ারি স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সংবিধিবদ্ধ বৃহত্তম পূর্ণাঙ্গ শিশু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। এ হাসপাতালের আওতায় এর আগে ‘ঢাকা শিশু হাসপাতাল সম্প্রসারণ’ নামে একটি প্রকল্প ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয়। সে সময় খরচ হয়েছিল ১৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা। তখন ১০ তলা ফাউন্ডেশনে তৃতীয়তলা পর্যন্ত ‘সি’ ব্লক তৈরি (বহির্বিভাগ টিকিট কাউন্টার, ডায়াগনস্টিক, কার্ডিয়াক সার্জারি) করা হয়। প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পটির মাধ্যমে ওই ফাউন্ডেশন অনুযায়ী এখন চতুর্থতলা থেকে নবমতলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট ৬৮১ শয্যাবিশিষ্ট। এর মধ্যে ৪২৮টি শয্যা পেয়িং এবং ২৫৩টি শয্যা (৩৭ শতাংশ) নন-পেয়িং বা ফ্রি। ফ্রি বেডে সেবাপ্রাপ্ত রোগীদের বিছানা ভাড়া, রোগ নির্ণয়ের সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মা ও শিশুর খাদ্য-পথ্য, অক্সিজেন, ওষুধ ও প্রতিষেধকসামগ্রী— ইত্যাদি প্রয়োজনীয় সুবিধাদি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, অবকাঠামো তথা শয্যার অভাবে গরিব রোগীদের চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে সিটি স্ক্যান, এমআরআইসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জরুরি মেডিকেল যন্ত্রপাতি না থাকায় এ-সংক্রান্ত পরীক্ষার জন্য রোগীদের হাসপাতালের বাইরে অন্যান্য হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রেফার করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য সচিব নাসরিন জাহান একনেকের জন্য তৈরি কার্যপত্রে পরিকল্পনা কমিশনের মতামত দিয়েছেন। এতে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট সম্প্রসারণ প্রকল্প-২-এর মাধ্যমে অবকাঠামো ও বিশেষায়িত সুবিধাদি সম্প্রসারণ করা হবে। শিশুস্বাস্থ্যের উন্নতি ও রোগীদের জন্য আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য একনেকে উপস্থাপনের সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।




