পিতার শেষ দেখা, সন্তানের নিঃশ্বাস

ছবি: আগামীর সময়
‘ওর মায়ের সাথে মিলে ছেলের জন্য নাম ঠিক করেছিলাম। পরিকল্পনা ছিল আকিকা করে নাম রাখব…’—কথাটা বলতে গিয়ে থেমে যান শান্ত মোল্লা। চোখে জমে ওঠে অদৃশ্য ভার। শব্দগুলো আর এগোয় না, কিন্তু বুকের ভেতরের শূন্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সদরঘাটের একটি পোশাক দোকানের বিক্রয়কর্মী শান্ত মোল্লার স্বপ্ন ছিল খুব সাধারণ— একটি সুস্থ সন্তান, আর ছোট্ট একটি সংসার। মাসে আয় সামান্য হলেও সন্তানের নিরাপদ জন্মের জন্য তিনি কোনো কমতি রাখতে চাননি। তাই স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েছেন।
২৪ মে রাতে প্রসব ব্যথা ওঠে জান্নাতুলের। প্রথমে ভর্তি করা হয় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে। জান্নাতুলের শরীরে ছিল রক্তস্বল্পতা—চিকিৎসকরা অপারেশনের প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু ঈদের ছুটিতে সিনিয়র চিকিৎসক না থাকায় শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়। পরদিন সকালে স্বামী শান্ত মোল্লা স্ত্রীকে নিয়ে যান আদ্-দ্বীন হাসপাতালে। খরচের চিন্তা না করেই বেছে নেন বেসরকারি চিকিৎসা, এই বিশ্বাসে যে সেখানেই ভালো সেবা মিলবে। ২৫ মে রাত আটটার দিকে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম নেয় তাদের ছেলেসন্তান। সন্তান ও মা দুজনই তখন সুস্থ বলে জানানো হয়।
কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে শুরু হয় অস্বাভাবিক এক পরিস্থিতি। একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন আরও কয়েকজন প্রসূতি মা ও তাদের নবজাতক। অভিযোগ, রাতের দিকে শিশুরা একে একে অস্বাভাবিকভাবে কান্নাকাটি করতে থাকে।
শান্ত মোল্লা রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাসায় বিশ্রাম নিতে যান। তিনি তখনো জানতেন না, সেটাই হবে তার ছেলের সঙ্গে শেষ দেখা। কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় সেই দীর্ঘ রাত— যেখানে একদিকে ছিল মায়ের জ্বর ও খিঁচুনি, অন্যদিকে নবজাতকের অস্বাভাবিক কান্না।
জান্নাতুলের ভাই কাউসার ইসলাম বলেছেন, রাতের শুরুতে ভাগ্নেকে কোলে নিয়েছিলেন তিনি। পরে তাকে ওয়ার্ড থেকে বের করে দেওয়া হয় পুরুষ সদস্য হওয়ায়। তিনি পাশের মসজিদে গিয়ে থাকেন। মাঝরাতে ফোন আসে— তার ভাগ্নে প্রচণ্ড কান্না করছে, মায়ের অবস্থাও ভালো নয়।
এরপর শুরু হয় এক উদ্বেগজনক রাত। হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক বা নার্স পাওয়া যাচ্ছিল না বলে অভিযোগ করেন স্বজনরা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একজন নার্স এসে দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেন এবং মায়ের জ্বর কমাতে ওষুধ দেন। কিন্তু পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আরও জটিল হয়ে ওঠে; বলছিলেন কাউসার।
কাউসার আরও জানিয়েছেন, রাতে হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে জান্নাতুলের সঙ্গে তার মা-ও ছিলেন। রাত ১টার পর থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত শিশুটি টানা কান্না করেছে। এরপর ও থেমে যায়। ঘুমিয়ে গেছে মনে করে নানির পাশে ঘুম পাড়িয়ে দেন তিনি। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে নানি দেখেন শিশুটির ঠোঁট নীল হয়ে গেছে। কাঁথা সরিয়ে দেখেন পুরো শরীরও নীল। তখন আইসিইউতে নিলে, চিকিৎসক জানান শিশুটি আর নেই।
কথা হচ্ছিল শান্ত মোল্লার সঙ্গে। বলছিলেন, ‘ওর মায়ের সাথে মিলে ছেলের জন্য নাম ঠিক করেছিলাম। পরিকল্পনা ছিল আকিকা করে নাম রাখার। হাসপাতালের লোকজনের অবহেলা আর খামখেয়ালিতে সেই সুযোগ পেলাম না। ছেলেকে বুকেও নিতে পারলাম না। বুঝতে পারিনি ছেলের সাথে আর দেখা হবে না। তাহলে আরেকটু আদর করতাম। আরেকটু বুকে জড়িয়ে রাখতাম।’
ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে ভেঙে পড়েন শান্ত মোল্লা। তার চোখে তখন শুধু শূন্যতা, আর কণ্ঠে অসহায় প্রশ্ন— ‘এত বড় অবহেলা কীভাবে হলো?’ তার অভিযোগ, হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই তার সন্তানকে হারাতে হয়েছে।
শান্ত মোল্লার দাবি খুব স্পষ্ট— দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ন্যায়বিচার। পাশাপাশি তিনি ক্ষতিপূরণের বিষয়েও আইনি পদক্ষেপ নিতে চান।
সন্তানহারা জান্নাতুল ফেরদৌস ১৭ বছরের কিশোরী। সারা দিন মন খারাপ করে বসে থাকেন। কান্নাকাটি করেন। খাওয়াদাওয়ার ঠিক নেই। ছেলের জন্য কেনা জামা-কাপড় ছুঁয়ে দেখে আর চোখের পানি ফেলেন। মাঝেমধ্যে বলে ওঠেন, ‘৯ মাসের বেশি কত কষ্ট-যন্ত্রণা সহ্য করে ছেলেকে পেটে রেখেছি। ৯টা দিনও মানিককে বুকে রাখতে পারলাম না।’
শুধু শান্ত আর জান্নাতুলের সন্তানই নয়; একইভাবে খালি হয়েছে আরও পাঁচ বাবা-মায়ের বুক। গত ২৭ মে ভোরে ঈদের আগের দিনের ঘটনা ছিল এটি। সেদিন রাজধানীর মগবাজারের হাসপাতালটির পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বাতাসের চেয়ে ভারী কোনো বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতির কারণে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় ওয়ার্ডে ১১ জন মা চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।




