অবহেলায় হাম, অপুষ্টি-মৃত্যু

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অপুষ্টি, হাম, ডেঙ্গু, ডায়রিয়া আর নিউমোনিয়ার মতো সংক্রমণ। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে টিকাদানে ঘাটতি, খাদ্যে বৈচিত্র্যের অভাব, দারিদ্র্য, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সংকট এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার মতো সমস্যা। ফলে একটি অসুস্থতা আরেকটি সমস্যাকে আরও গভীর করছে। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ছে দরিদ্র ও অপুষ্ট শিশু।
চলতি বছরের হাম পরিস্থিতি এই সংকটের ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮১৪ সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে ১ হাজার ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বছরের শুরুতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছিল, হাম আক্রান্তের বড় অংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী এবং মৃত্যুর বড় অংশ ছিল টিকা না পাওয়া দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে। ডব্লিউএইচও বলেছে, ২০২৪-২৫ সালে দেশ জুড়ে এমআর টিকার মজুদ ফুরিয়ে যাওয়া, নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতি এবং দীর্ঘ সময় জাতীয় পর্যায়ে সাপ্লিমেন্টারি ক্যাম্পেইন না থাকায় বিপুলসংখ্যক শিশু হাম প্রতিরোধের বাইরে চলে যায়। অর্থাৎ যে রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে, সেই রোগেই শিশু মারা যাচ্ছে— এ প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই।
ইউনিসেফের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাবের পেছনে কয়েক বছরের জমে থাকা ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০১৯ সালে হাম টিকার দ্বিতীয় ডোজের কাভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ; ২০২৩ সালে তা নেমে আসে ৮০ দশমিক ৭ শতাংশে। ইউনিসেফ বলছে, প্রায় ১ কোটি শিশু প্রথম ডোজ এবং প্রায় ২ কোটি শিশু দ্বিতীয় ডোজের ক্ষেত্রে হাম সংক্রমণের ঝুঁকিতে ছিল।
ডব্লিউএইচওর ভাষায়, হাম বিশেষ করে অপুষ্ট শিশু এবং ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিতে থাকা শিশুদের জন্য বেশি বিপজ্জনক। হামের জটিলতার মধ্যে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্রবণশক্তি হারানো, অন্ধত্ব এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহও রয়েছে।
অপুষ্টির ভিত আরও দুর্বল: হামের পাশাপাশি দেশের শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৪ শতাংশ খর্বকায়, ১২ দশমিক ৯ শতাংশ কৃশকায় এবং ২৩ শতাংশ কম ওজনের। ছয় থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের মাত্র ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্য পায়। একই বয়সী ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুখাদ্য দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ শিশুর শরীর গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রতি তিনজনের দুজনই প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্যময় খাবার পাচ্ছে না।
এই ঘাটতি শুধু ক্ষুধার বিষয় নয়। পুষ্টির ঘাটতি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে। আবার সংক্রমণের সময় জ্বর, বমি, ডায়রিয়া ও ক্ষুধামান্দ্যর কারণে খাবার গ্রহণ কমে যায়। ফলে অসুস্থতা অপুষ্টিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অপুষ্ট শিশু আবার সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এভাবেই তৈরি হয় একটি ভয়াবহ দুষ্টচক্র।
ডেঙ্গুও যোগ করছে নতুন চাপ: এই সংকটের মধ্যে ডেঙ্গুও শিশুদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ৬১ হাজার ৯৭২ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং মারা গেছে ১৮৪ জন। শুধু ২০ সেপ্টেম্বরের আগের ২৪ ঘণ্টাতেই ১ হাজার ৫৯৩ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ডেঙ্গুতে জ্বর, বমি, ক্ষুধামান্দ্য ও দুর্বলতার কারণে শিশু স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করতে পারে না। গুরুতর অবস্থায় শরীরে তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে। আগে থেকেই অপুষ্ট শিশুর ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। শুধু হাম বা ডেঙ্গু নয়; সংক্রমণজনিত রোগের ক্ষেত্রে একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
মৃত্যুফাঁদের মাঝখানে দরিদ্র শিশুরা: শিশুর অপুষ্টির সঙ্গে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। দরিদ্র পরিবারে ডিম, মাছ, মাংস, দুধ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত রাখা কঠিন। শিশুর খাদ্যতালিকা তখন ভাত, আলু বা অপেক্ষাকৃত সস্তা খাবারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা। ফলে একটি শিশু শুধু একটি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে না— সে একসঙ্গে অপুষ্টি, সংক্রমণ, চিকিৎসার বিলম্ব এবং দারিদ্র্যের চক্রে আটকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, দরিদ্র পরিবারে আমিষের চাহিদা পূরণ হতো ডিম থেকে, সেটির দামও বেশি। মাছ, মাংসে হাতই দেওয়া যায় না। ফলে শিশুদের পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বা এবং সন্তানকে বুকের দুধ পান করান— এমন মায়েরাও অপুষ্টির ঝুঁকিতে পড়ছেন। যার প্রভাব গিয়ে সরাসরি পড়ছে শিশুদের ওপর। এ পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারকে সামাজিক সহায়তা আরও বাড়াতে হবে। দরিদ্র পরিবারে মিলের সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে হবে।
দায় শুধু পরিবারের নয়: শিশুর টিকা না পাওয়া বা অপুষ্ট হওয়ার দায় শুধু মা-বাবার ওপর চাপিয়ে দিলে সংকটের মূল কারণ আড়ালে থেকে যাবে। টিকা সরবরাহ, নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রম, পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সক্ষমতা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং দরিদ্র পরিবারের সামাজিক সুরক্ষা— সবই রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ।
২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাব সেই ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো স্পষ্ট করেছে। ডব্লিউএইচও বলেছে, সাম্প্রতিক টিকাদান ঘাটতি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ফারাক বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
অবশ্যই প্রতিটি শিশুমৃত্যুকে সরাসরি ‘অবহেলার মৃত্যু’ বলা যাবে না। কিন্তু যখন প্রতিরোধযোগ্য রোগে বিপুলসংখ্যক শিশু আক্রান্ত হয়, টিকার ঘাটতি সৃষ্টি হয়, অপুষ্ট শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে এবং চিকিৎসা নিতে দেরি হয়, তখন স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি, সরবরাহব্যবস্থা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এই মৃত্যুফাঁদ থেকে বের হতে হলে শুধু অসুস্থ শিশুকে হাসপাতালে এনে চিকিৎসা করলেই হবে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, শুধু অপুষ্ট শিশুকে শনাক্ত করে চিকিৎসা করলেই হবে না। জন্মের পর বুকের দুধ, ছয় মাস পর বয়স উপযোগী পরিপূরক খাবার, নিয়মিত বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ, টিকাদান, ভিটামিন ও প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাম, ডেঙ্গু, ডায়রিয়াসহ সংক্রমণ দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।



