ডিজিটাল যুগেও দ্বৈত ভোটার সাড়ে ৪ লাখ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের সব ভোটারের আঙুলের ছাপ, আইরিশ ও ব্যক্তিগত তথ্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে কেউ দ্বিতীয়বার ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে চাইলে তা শনাক্ত হওয়ার কথা। তবে এরপরও ভোটার তালিকায় পাওয়া যাচ্ছে একই ব্যক্তির একাধিক রেকর্ড।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকায় একই ব্যক্তির একাধিক রেকর্ড রয়েছে ৪ লাখ ৬১ হাজার ৫৭৬টি। এর মধ্যে ২৬ হাজার ২৭২টি রেকর্ড নিষ্পত্তি করেছে ইসি। এসব ঘটনায় মামলা রয়েছে ২৫৭টি।
শুধু দ্বৈত ভোটারের রেকর্ডই নয়, জীবিত ব্যক্তিকে ভোটার তালিকায় ‘মৃত’ হিসেবে চিহ্নিত করার তথ্য রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে এমন ১২০টি আবেদন। ইসির আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসগুলো থেকে পাঠানো আগস্টের তথ্যের ভিত্তিতে পাওয়া গেছে এই হিসাব।
দ্বৈত রেকর্ড সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহে: ইসির নথি অনুযায়ী, ১০টি অঞ্চলের মধ্যে দ্বৈত ভোটারের রেকর্ড সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহে। এ অঞ্চলে দ্বৈত ভোটারের রেকর্ড রয়েছে ৭৯ হাজার ৭২৭টি। এরপর রয়েছে ঢাকা, যেখানে এ ধরনের রেকর্ড ৭৬ হাজার ২৭৯টি।
এ ছাড়া কুমিল্লায় ৬২ হাজার ৬১০টি, রাজশাহীতে ৬১ হাজার ৫২২টি, রংপুরে ৪৭ হাজার ৮৮২টি, বরিশালে ৩৬ হাজার ৬১৭টি, ফরিদপুরে ২৭ হাজার ৯৪৬টি, চট্টগ্রামে ২৬ হাজার ৯০৯টি, সিলেটে ২২ হাজার ৯৮টি এবং খুলনায় ১৯ হাজার ৯৮৬টি দ্বৈত রেকর্ড রয়েছে।
নিষ্পত্তি হয়েছে ২৬ হাজারের বেশি রেকর্ড: দ্বৈত রেকর্ড শনাক্ত হওয়ার পর কিছু ক্ষেত্রে তা নিষ্পত্তিও করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি রেকর্ড নিষ্পত্তি হয়েছে বরিশালে, ১০ হাজার ৬০৬টি। এ ছাড়া ঢাকা অঞ্চলে ৯ হাজার ৪৯৯টি, খুলনায় ২ হাজার ১৫৫টি, রাজশাহীতে ১ হাজার ২৬২টি, ময়মনসিংহে ৯৮১টি, কুমিল্লায় ৭১৫টি, ফরিদপুরে ৪৫৭টি, চট্টগ্রামে ৩০৮টি, সিলেটে ১৩৩টি এবং রংপুরে ১২০টি রেকর্ড নিষ্পত্তির তথ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে দ্বৈত রেকর্ড নিষ্পত্তি হয়েছে ২৬ হাজার ২৩৬টি।
দ্বৈত ভোটার-সংক্রান্ত মামলা রয়েছে ২৫৭টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা চট্টগ্রামে, ৮১টি। ময়মনসিংহে ৩৪টি, বরিশালে ৩০টি, রাজশাহীতে ২৯টি এবং ঢাকায় ২৬টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া কুমিল্লা ও ফরিদপুরে ২৫টি করে এবং সাতটি মামলা রয়েছে খুলনায়। রংপুর ও সিলেটে কোনো মামলার তথ্য নেই।
জীবিত ব্যক্তি ভোটার তালিকায় ‘মৃত’: জীবিত থাকা সত্ত্বেও ভোটার তালিকায় ‘মৃত’ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের স্ট্যাটাস সংশোধনের আবেদনের তথ্যও রয়েছে ইসির নথিতে। আগস্ট পর্যন্ত এমন আবেদন জমা পড়েছে ৪১ হাজার ৪৪৯টি।
এর মধ্যে ময়মনসিংহে ৬ হাজার ৮৩৭টি, রংপুরে ৬ হাজার ২৪৬টি, খুলনায় ৬ হাজার ১৯০টি, রাজশাহীতে ৫ হাজার ৮৯৮টি, কুমিল্লায় ৪ হাজার ৭৯১টি, বরিশালে ২ হাজার ৮১৭টি, ঢাকায় ২ হাজার ৭২৭টি, ফরিদপুরে ২ হাজার ২৪৪টি, চট্টগ্রামে ১ হাজার ৭৬২টি এবং সিলেটে ১ হাজার ৮৭৬টি আবেদন রয়েছে।
‘মৃত’ স্ট্যাটাস সংশোধনের জন্য করা ৪১ হাজার ৪৪৯টি আবেদনের মধ্যে এখনো নিষ্পত্তি হয়নি ১২০টি।
ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন: নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে নিবন্ধিত ভোটারদের আঙুলের ছাপ ও ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত থাকায় একজন ব্যক্তি দ্বিতীয়বার ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার চেষ্টা করলে তা শনাক্ত হওয়ার কথা। এরপরও এত বিপুলসংখ্যক দ্বৈত রেকর্ড শনাক্ত হওয়ায় ভোটার নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা চলতে থাকলে ভোটার তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
আইনেও একাধিকবার ভোটার হওয়ার বিষয়ে শাস্তির বিধান রয়েছে। ভোটার তালিকা ও জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন অনুযায়ী, একাধিকবার ভোটার হওয়া, জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার উদ্দেশ্যে জেনে-শুনে মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য দেওয়া কিংবা তথ্য গোপন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব অপরাধের জন্য রয়েছে জেল ও জরিমানা।
নিবন্ধন কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলা করা বা ইচ্ছাকৃত ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্যও রয়েছে শাস্তির বিধান।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ফেমার প্রেসিডেন্ট মনিরা খান বলেছেন, ‘আমরা যদি ওয়ান ম্যান, ওয়ান ভোটে বিশ্বাস করি, একজন মানুষ, এক নাগরিক— তার একটা ভোট, এটাই তো। তাহলে নির্বাচন কমিশন যখন ভোটার রেজিস্ট্রেশন করেছে এবং নিয়মিত হালনাগাদ করেছে, তখন তাদের দায়িত্বে দুর্বলতা ছিল কি না, সেটি দেখতে হবে।’
ইসির ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারে সব তথ্য সংরক্ষিত থাকার পরও কীভাবে দ্বৈত ভোটার নিবন্ধন হয়েছে— সে বিষয়ে জানতে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি) মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি তিনি।



