অনেক সংকটে প্রশ্ন সক্ষমতার

ছবি: মহুবার রহমান
দুপুরের রোদ যেন আগুন ছড়াচ্ছে ঢাকার রাস্তায়। উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা চাতক পাখির মতো আকাশে তাকিয়ে বৃষ্টির অপেক্ষায়। দক্ষিণের কৃষিজমি ডুবছে নোনাজলে; সেখানে মাটির উর্বরতার সঙ্গে নারীরা হারাচ্ছেন প্রজনন সক্ষমতা। বদলে গেছে পুবের হাওর এলাকায় প্রকৃতির চরিত্র। রুক্ষ হয়ে উঠছে একসময়ের সুজলা-সুফলা পশ্চিমাঞ্চল।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত এই বদল বাংলাদেশকে দাঁড় করিয়েছে শীর্ষ জলবায়ু ঝুঁকির তালিকায়। দেশের মানুষকে প্রতিদিনই তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো সংকটগুলো মোকাবিলা করে বাঁচতে হচ্ছে। এমন বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আজ শুক্রবার বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস।
দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য— ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’। আজ হয়তো নানা কর্মসূচি, সভা-সেমিনারে উঠে আসবে প্রকৃতি রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের লাগাম টানার কথা। কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন না হলে দিনের পর দিন উল্লিখিত সংকট সঙ্গী করে বাঁচতে হবে আমাদের, করতে হবে টিকে থাকার লড়াই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন দেশের প্রায় প্রতিটি খাতে দৃশ্যমান। কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, নগর ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে ঝুঁকি। এমন অবস্থায় আতঙ্কিত না হয়ে যথাযথ প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
গেল এক দশকের আবহাওয়া পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব দুটোই বেড়েছে। আগে যেখানে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত তাপপ্রবাহ সীমাবদ্ধ থাকত, এখন তা অনেক ক্ষেত্রে বিস্তৃত হচ্ছে অক্টোবর পর্যন্ত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা নিয়মিত দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে বাড়ছে বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি। ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহ বেড়ে বন্যার তীব্রতা বাড়ছে। গত কয়েক দশকে বড় বড় বন্যায় লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে ফসল, অবকাঠামো। ঝুঁকিতে পড়েছে জীবিকা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর নদীতে বিলীন হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে পদ্মা ও যমুনা নদীর ভাঙনে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ হারিয়েছে বাস্তুভিটা।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব বাংলাদেশে এরই মধ্যে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ১৯৮০ সালের পর থেকে দেশের গড় তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্যানেলের পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সম্প্রতি ফেনী ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে তার ভাষ্য, ওই সময় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের ত্রিপুরা, অরুণাচল, নাগাল্যান্ডসহ পাশের এলাকায় অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়েছিল।
এদিকে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ধীরে ধীরে বেড়ে উপকূলীয় অঞ্চলকে গ্রাস করছে নোনাজলে। কমে যাচ্ছে কৃষি উৎপাদন। অতিরিক্ত লবণ প্রভাব ফেলছে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যেও।



