সাক্ষাৎকার
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নতুন উচ্চতায় নেওয়া হবে

মোহা. খোরশেদ আলম
নতুন সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের মধ্যে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে চায়না চেম্বারের পক্ষ থেকে পেশ করা হয়েছে এক সুদূরপ্রসারী রূপরেখা। প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি দূর করা, চীনা ব্যাংক স্থাপন, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের পথ সুগম করতে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম আগামীর সময়ের কাছে তুলে ধরেছেন এক দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিজনেস এডিটর মিজান চৌধুরী
আগামীর সময়: বিসিসিসিআইর পক্ষ থেকে চীনের রাষ্ট্রদূতের কাছে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার মূল বিষয়গুলো কী ছিল?
মোহা. খোরশেদ আলম: বাংলাদেশ-চীন চেম্বারের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমার দুই বছরের একটি সুনির্দিষ্ট ভিশন রয়েছে। ১৯৮৫ সাল থেকে চীনে ১১৬ বার সফরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, চীন শুধু নিজেদের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেনি; যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি ও কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোর প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করে সাশ্রয়ী উপায়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সাত দফা লিখিত প্রস্তাব দিয়েছি।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো হলো—
বাংলাদেশে চীনা ব্যাংক স্থাপন: প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে কোনো চীনা ব্যাংক নেই। অথচ শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের ব্যাংক এখানে রয়েছে। আমরা বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংক স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছি। এতে চীনা মূলধন দেশে আসবে এবং তারল্য ও মূলধনসংকটে থাকা স্থানীয় শিল্পকারখানাগুলো চলতি মূলধনের সহায়তা পেতে পারে। চীনা বিনিয়োগ বাড়লে দেশের পুঁজিবাজারও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ইউয়ানে বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়: ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে চীনের সঙ্গে সরাসরি ইউয়ানে লেনদেন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছি। বর্তমানে চীন থেকে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ইউয়ানে লেনদেন হচ্ছে। সরাসরি এলসি খোলা গেলে মধ্যবর্তী মুদ্রা রূপান্তরের খরচ কমবে। এতে লেনদেন ব্যয় প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমবে।
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ আউটলেট: চীন বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য রপ্তানির সুযোগ দিলেও গত পাঁচ বছরে আমরা এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারিনি। তাই চীনের বড় শহরগুলোতে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য ডেডিকেটেড আউটলেট বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কুনমিংয়ে ২ হাজার বর্গমিটারের একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র এবং সমপরিমাণ আয়তনের একটি গোডাউন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইপিবি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হবে। এখানে পাট, চামড়া, সিরামিক, ওষুধ ও কৃষিপণ্যসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্য চীনা ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে তুলে ধরা যাবে।
কারিগরি শিক্ষা ও উৎপাদন খরচ কমানো: চীনের তুলনায় বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় বেশি। তাই দেশে অন্তত ২০টি আধুনিক পলিটেকনিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠায় চীনা সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছি। এর মাধ্যমে তরুণ ও কর্মীরা আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি এবং কম খরচে উৎপাদনের কৌশল শিখতে পারবেন। দক্ষতা বাড়াতে পারলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
ম্যানমেইড ফাইবারে বিনিয়োগ: দেশের বস্ত্রশিল্পে প্রায় ৭২ শতাংশ ম্যানমেইড ফাইবার বা নন-কটন পণ্য ব্যবহৃত হয়। এর প্রধান কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এ নির্ভরতা কমাতে চট্টগ্রামে ৩০০ বিঘা জমির ওপর প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার একটি নন-কটন বা লায়োসেল প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে দেশে সুতার কাঁচামাল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং মূল্য সংযোজন বাড়বে।
আগামীর সময়: দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা বাংলাদেশ-চীন মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আপনাদের মূল্যায়ন কী?
মোহা. খোরশেদ আলম: এফটিএ নিয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করলেই হবে না; স্থানীয় শিল্প ও উদীয়মান কারখানাগুলোকেও সুরক্ষা দিতে হবে। চীন থেকে কোনো পণ্য শুল্কমুক্তভাবে এসে স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা করলে দেশীয় মিল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই চুক্তিতে এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার, যাতে চীনা কাঁচামাল বা পণ্য মূল্য সংযোজন করে পুনরায় রপ্তানি করা যায়। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রে দেশীয় শিল্পের স্বার্থে প্রয়োজনীয় শুল্ক বা সেফগার্ড রাখা দরকার।
আগামীর সময়: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় চীন কি বিকল্প জ্বালানি বা সৌর প্রযুক্তিতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে?
মোহা. খোরশেদ আলম: চীন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে। সম্প্রতি চীনা রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে বর্জ্য পুড়িয়ে তাপ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সৌরশক্তি আহরণ, উইন্ড পাওয়ার এবং সাশ্রয়ী লিথিয়াম ব্যাটারি স্টোরেজে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে তারা। স্থানীয় কয়লা সম্পদ উত্তোলনেও চীনা বিনিয়োগকারীরা কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।
আগামীর সময়: প্রস্তাবগুলোর অগ্রগতি বা ফলোআপ কেমন হচ্ছে?
মোহা. খোরশেদ আলম: নিয়মিত ফলোআপ চলছে। গত সপ্তাহেই ইউনান প্রদেশ থেকে ৩২ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বিটুবি বৈঠক করেছে। চীনা বিনিয়োগকারী ও বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংযোগ তৈরি করাই আমাদের অন্যতম কাজ। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগের বিষয়েও আলোচনা চলছে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।



