এক ভূমির দায়িত্বে দুই মন্ত্রণালয়
কমছে না দুর্নীতি, থামছে না হয়রানি
- ভূমি রেকর্ড আর রেজিস্ট্রির আলাদা দপ্তরে সমন্বয়হীনতা
- মালিকানা যাচাইয়ের নেই সুযোগ, সহজেই তৈরি জাল দলিল
- হয়রানি কমাতে আসছে এআই, প্রবর্তন হবে ‘ভূমি সনদ’

জমি কেনাই যেন আতঙ্কের এক কাজ। বছরের পর বছর ঘুরতে হয় সরকারি দপ্তরে দপ্তরে। তবুও মেলে না নিশ্চিন্ত মালিকানা। কখনো কখনো জাল দলিলে খোয়া যায় জীবনের সব সঞ্চয়। এমন দুর্ভোগের মূল কারণ দুই মন্ত্রণালয়ের টানাটানি। দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পুরোপুরি নেই ভূমি মন্ত্রণালয়ের হাতে। ভূমি মালিকানার রেকর্ড রাখে ভূমি মন্ত্রণালয়। আর দলিল রেজিস্ট্রি করে আইন মন্ত্রণালয়। এ দুই কাঠামোর মধ্যে নেই কোনো সমন্বয়।
ফলাফল ভয়াবহ। সাব-রেজিস্ট্রার জানতে পারেন না জমির আসল মালিক কে। ফলে কমছে না দুর্নীতি-হয়রানি। তৈরি হচ্ছে জাল দলিল। একই জমি বিক্রি হচ্ছে একাধিকবার। যে কারণে বাড়ছে ভূমি বিরোধ, মামলা ও সহিংসতার সংখ্যাও। হচ্ছে আইনশৃঙ্খলার অবনতি। এসব অনিয়ম বন্ধে নতুন পরিকল্পনা করছে সরকার। এমন প্রেক্ষাপটে ভূমি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। সেই সঙ্গে অন্যান্য প্রযুক্তিগত সুবিধা সম্প্রসারণ এবং প্রবর্তন করা হবে একক ‘ভূমি সনদ’ ব্যবস্থা। এই সনদের ফলে ভূমি মালিকদের আর করতে হবে না পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি। সনদ থাকলেই মিলবে চূড়ান্ত মালিকানা। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এমন মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক’ বা পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামোতে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় পুরো ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ চলছে। ডিজিটাইজেশন শেষ হলে আসবে ‘ল্যান্ড ট্রাস্ট’ ব্যবস্থা।
এদিকে দাপ্তরিক জটিলতার পাশাপাশি যোগ হয়েছে জলবায়ু সংকটের নতুন থাবা। দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ভূমিক্ষয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার বিশ্ব গড়ের চেয়ে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার। তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে উপকূলীয় অঞ্চলের ৩২ শতাংশ এলাকা। এতে বিপন্ন হবে ২৮ শতাংশ মানুষের জীবন।
একদিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অন্যদিকে প্রকৃতির ভয়াল রূপ। দ্বিমুখী এই সংকট দূর করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী শহর ও মানব বসতিগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, স্থিতিস্থাপক এবং টেকসই করে তোলা বাধ্যতামূলক। সরকারের জন্য স্বল্পতম সময়ে এবং সর্বনিম্ন খরচে জনগণকে হয়রানিমুক্ত ও মানসম্মত সেবা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি সেবা দেওয়ার পুরনো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি পরিবর্তন করে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা দেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণের সময় এসেছে। যেখানে সেবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হবে। এতে মানবিক স্পর্শ প্রায় শূন্যে নেমে আসবে। যদি সব ভূমি পরিষেবা একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসা সম্ভব হয়, তবে জনবান্ধব ভূমি পরিষেবার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি আসবে।’
‘ভূমি মন্ত্রণালয় এই লক্ষ্যের দিকে কাজ করছে এবং এরই মধ্যে অনলাইন মিউটেশন, অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর সংগ্রহ, অনলাইন স্বত্বাধিকার দলিল প্রদান ব্যবস্থার মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। সামগ্রিকভাবে আধুনিক ও জনবান্ধব ওয়ানস্টপ ভূমি পরিষেবা দিতে ভূমি রেকর্ড তৈরি ও হালনাগাদের পাশাপাশি ভূমি হস্তান্তর দলিল নিবন্ধনের জন্য একক প্ল্যাটফর্ম থাকা দরকার’— যোগ করলেন মঞ্জুর হোসেন।
ফ্রেমওয়ার্কে জিইডি বলেছে— ভূমি হস্তান্তর দলিল সম্পাদন এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার বিষয় দুটি ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে নীতি, আইন, বিধি প্রণয়ন ও হালনাগাদের ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য তৈরি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে। ভূমির মালিকানা-সংক্রান্ত সব নথি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ভূমি অফিসগুলোতে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়; অন্যদিকে ভূমি নিবন্ধন করা হয় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে। ফলে সাব-রেজিস্ট্রারদের পক্ষে মালিকানা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই প্রায়ই নিবন্ধিত হয় জাল দলিল। কখনো কখনো এক খণ্ড জমি দুই বা ততোধিকবার বিক্রি করা হয়। এর ফলে ভূমি বিরোধ ও মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে। ফলস্বরূপ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে।
দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় যে দুর্নীতি, অনিয়ম, জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে, তা অস্বীকারের সুযোগ নেই বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘এগুলো বন্ধ করতে হলে ডিজিটালাইজেশনের বিকল্প নেই। এখানে একটি গোষ্ঠী আছে, যারা চেষ্টা করবে এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত বা ঝুলিয়ে রাখার। কিন্তু ফ্রেমওয়ার্কে যেসব উদ্যোগ আছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন জরুরি। বিশেষ করে ভূমির বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল করে পেপারলেস করা দরকার। কিন্তু ডিজিটাল করে আবার কাগজ নিয়ে অফিসে যেতে হলে হবে না। এতে ভালো ফল তো হবেই না, উল্টো হয়রানি বাড়তে পারে।’
জিইডি আরও বলেছে, দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার তিনটি প্রধান ক্ষেত্র হলো— নথিপত্র প্রস্তুতকরণ, ব্যবস্থাপনা এবং নিবন্ধন। নথিপত্র প্রস্তুত করে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের (ডিএলআরএস) কার্যালয়। ভূমি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে মাঠ প্রশাসন এবং নিবন্ধনের দায়িত্বে নিবন্ধন বিভাগ (আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন)। ভূমিসংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার সম্পৃক্ততাই একটি একক, সমন্বিত ও হালনাগাদ ভূমি তথ্য ব্যবস্থা এবং হয়রানিমুক্ত ভূমি পরিষেবা দেওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। এমন পরিস্থিতিতে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং কোরিয়ার পক্ষে দেশটির ভূমি, পরিকাঠামো ও পরিবহন মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে ডিজিটাইজড ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে অপারেশন (ডিসিএসও) এবং সমন্বিত ভূমি তথ্য ব্যবস্থা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা-টেকসই অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এরপর পরিচালিত হয়েছে প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা। এখন যথাযথভাবে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা প্রয়োজন।
জিইডি বলেছে, একটি ভূমি নিবন্ধন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে। যেখানে রাষ্ট্র একটি চূড়ান্ত মালিকানা সনদ জারির মাধ্যমে সম্পত্তির মালিকানার নিশ্চয়তা দেবে। এ ব্যবস্থার প্রধান সুবিধা হলো— জমির মালিকানার নিশ্চয়তা বৃদ্ধি এবং ভূমিসংক্রান্ত লেনদেন সহজ করা। এ ছাড়া ভূমি ট্রাস্ট আইন প্রণয়ন হবে। পাশাপাশি তৈরি হবে ল্যান্ড ট্রাস্ট প্লাস (এলটিপি)। এর মাধ্যমে জনগণের মালিকানা অধিকার ক্ষুণ্ন না করে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে সম্প্রসারণযোগ্য ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণের বর্তমান ব্যবস্থা করা হবে আরও উন্নত। মন্ত্রণালয় প্রকৃত ডিজিটাইজড ভূমি রেকর্ড তৈরির জন্য জরুরি ভিত্তিতে কাজ করছে, যা ভূমি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় এই নতুন ধারণাটি গ্রহণের পথ প্রশস্ত করবে। ল্যান্ড ট্রাস্ট নীতিটি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হবে।
পরিকল্পনা সচিব এসএম শাকিল আকতার বলছিলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি এই ফ্রেমওয়ার্কের লক্ষ্যগুলো যাতে বাস্তবায়ন করা যায়। সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করবে। শক্তভাবে এবং নিয়মিত মনিটরিং করা হবে। তাহলে যে মন্ত্রণালয়কে যেসব কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে অগ্রগতির হিসাব রাখা যাবে।’
যেসব কারণে হচ্ছে ভূমি ক্ষয়: জিইডি বলছে, দেশে ভূমি অবক্ষয়ের প্রধান কারণগুলো হলো— পানিজনিত ক্ষয়, মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা এবং সক্রিয় প্লাবনভূমির গতিশীলতা। পানিজনিত ক্ষয় এবং মাটির উর্বরতা হ্রাস হলো প্রাথমিক কারণ। ভূমি অবক্ষয়ের আরও একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো— জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। প্রায় ৭৫ শতাংশ পাহাড়ি অঞ্চল ক্ষয়ের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
আরও বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, প্লাবন, ভূমিক্ষয় এবং ভূগর্ভস্থ জলস্তরে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে প্রভাবিত করছে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের মোট ভূখণ্ডের ৩২ শতাংশ উপকূলীয় অঞ্চলে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির সামগ্রিক প্রবণতা বার্ষিক ৬ থেকে ২০ মিলিমিটারের মধ্যে। এটি বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে ২ থেকে ৫ গুণ বেশি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পর্যায়ক্রমে দেশের মোট জনসংখ্যার ২৮ শতাংশের জীবন ও কর্মকাণ্ড বিপন্ন করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।







