শুভ জন্মদিন নুসরাত ফতেহ আলী খান
ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে আবেগের বিস্তার

ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খান (১৩ অক্টোবর ১৯৪৮—১৬ আগস্ট ১৯৯৭)
কিছু কণ্ঠ বোঝার জন্য ভাষা জানা জরুরি নয়। গানের কথা না বুঝেও যেখানে শ্রোতা টের পায় ভেতরের আকুতি, সুরের ওঠানামা, গায়কির গভীরতা। ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খানের কণ্ঠ তেমনই এক বিস্ময়— যেখানে কাওয়ালির ঐতিহ্য, সুফি আধ্যাত্মিকতা আর আধুনিক সংগীতের সাহস মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
আজ ১৩ অক্টোবর, এই কিংবদন্তির জন্মদিন। ১৯৪৮ সালের আজকের দিনে সে সময়ের ব্রিটিশ ভারতের লায়ালপুরে, বর্তমান পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। কাওয়ালির শাহেনশাহ হিসেবে পরিচিত এই শিল্পী প্রায় তিন দশক আগে পৃথিবী ছেড়ে গেছেন, তবু তার কণ্ঠ আজও নতুন শ্রোতাকে টানে, পুরনো শ্রোতাকে ফিরিয়ে নেয় স্মৃতির কাছে।
নুসরাত ফতেহ আলী খানের সংগীতযাত্রা আকস্মিক উত্থান ছিল না। তার পেছনে প্রায় ছয় শ বছরের পারিবারিক কাওয়ালি ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। তার পরিবার কয়েক শতাব্দী ধরে কাওয়ালি পরিবেশনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। বাবা ফতেহ আলী খান ছিলেন প্রখ্যাত কাওয়াল ও সংগীতজ্ঞ। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাবা প্রথমে চাননি নুসরাত পারিবারিক পেশায় আসুক। তিনি চেয়েছিলেন ছেলে চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করুক, কারণ তিনি মনে করতেন কাওয়ালি শিল্পীদের সামাজিক মর্যাদা তেমন ভালো কিছু নয়। নুসরাত ছিলেন পরিবারের পঞ্চম সন্তান এবং প্রথম পুত্র। চার বড় বোন ও ছোট ভাই ফররুখ ফতেহ আলীকে নিয়ে ফয়সালাবাদে বেড়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু সংগীতের প্রতি তার একাগ্রতা, সুরের প্রতি মুগ্ধতা দেখে বাবা শেষে নিজের ইচ্ছা ত্যাগ করেন এবং পুত্রকে কাওয়ালিতে আরও দক্ষ হওয়ার সুযোগ দেন।
তার গানের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল স্বরের ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ। কখনো কোমল ও ধীর সুরে শুরু করে মুহূর্তেই কণ্ঠের তীব্রতা বাড়িয়ে দিতেন; আবার একই পঙ্ক্তি নানা ভঙ্গিতে গেয়ে তৈরি করতেন নতুন আবেগের স্তর
১৯৬৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের কাওয়ালি ঐতিহ্য এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব নুসরাতের কাঁধে এসে পড়ে। আগে থেকেই তিনি সংগীতের নানা দিক সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিলেন; কাওয়ালির পাশাপাশি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের কিছু ধারাও তার গায়কী সমৃদ্ধ করেছিল। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি প্রকাশ্যে কাওয়ালি পরিবেশন শুরু করেন। প্রথম দিকে পরিবারের অন্য শিল্পীদের সঙ্গে গাইলেও ধীরে ধীরে নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠে তিনি আলাদা হয়ে ওঠেন। ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালির কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেও স্বরের বিস্তার, আবেগের প্রকাশ আর দীর্ঘ সময় ধরে শ্রোতা ধরে রাখার ক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
গল্প-উপন্যাসে ঢাকা
১২ অক্টোবর ২০২৬
কাওয়ালি শব্দের অর্থ ‘উচ্চারণ’। এটি সুফি ভক্তিমূলক সংগীতের একটি রূপ, যেখানে মূলত মহান আল্লাহ, মুহাম্মদ (সা.) ও তার জামাতা ইমাম আলী ইবনে আবি তালিবের প্রশংসা করা হয়। উর্দু ও পাঞ্জাবি ভাষায়, কখনো ফারসিতেও গাওয়া এই ধারার সূত্রপাত ত্রয়োদশ শতকের ভারতবর্ষে। এই সংগীতে আধ্যাত্মিক কবিতা, পুনরাবৃত্তিমূলক পঙ্ক্তি, তবলা-হারমোনিয়াম আর সমবেত কণ্ঠের বিশেষ ভূমিকা থাকে।
নুসরাত ফতেহ আলী খান এই ঐতিহ্য ধারণ করেই নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। তার গানের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল স্বরের ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ। কখনো কোমল ও ধীর সুরে শুরু করে মুহূর্তেই কণ্ঠের তীব্রতা বাড়িয়ে দিতেন; আবার একই পঙ্ক্তি নানা ভঙ্গিতে গেয়ে তৈরি করতেন নতুন আবেগের স্তর। ‘আল্লাহ হু আল্লাহু’, ‘দমা দম মাস্ত কালান্দার’, ‘হক আলী আলী’র মতো কাওয়ালি তার পরিবেশনায় ব্যাপক পরিচিতি পায়।
তার সাফল্যের কারণ কেবল কণ্ঠের কারুকাজ ছিল না। দীর্ঘ পরিবেশনার মধ্যেও শ্রোতার সঙ্গে সংযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা ছিল তার অন্যতম শক্তি। ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য সত্ত্বেও তার গানের আবেগ মানুষের কাছে পৌঁছাত। গ্র্যামি জয়ী পাকিস্তানি গায়িকা আরুজ আফতাব বলেছেন, মাত্র আট বছর বয়সে, সৌদিতে থাকার সময় মা-বাবার গাড়িতে সবচেয়ে বেশি বাজত নুসরাতের গান। তিনি বলেন, ‘নুসরাতের কাওয়ালিগুলোর সেই সংস্করণ আমি কখনো ভুলতে পারব না; সেগুলো আমার ছোট্ট শরীরে যেভাবে অনুরণিত হতো, তাও ভোলা সম্ভব নয়।’
নুসরাতের সংগীতজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার প্রবেশ। ১৯৮৫ সালে যুক্তরাজ্যের ওম্যাড উৎসবে তার পরিবেশনা পশ্চিমা শ্রোতাদের মধ্যে কাওয়ালিকে নতুনভাবে পরিচিত করে তোলে। পিটার গ্যাব্রিয়েলের প্রতিষ্ঠিত রিয়েল ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের সঙ্গেও তিনি যুক্ত হন। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত ‘মাস্ত মাস্ত’ অ্যালবামটি কানাডীয় সংগীতশিল্পী ও প্রযোজক মাইকেল ব্রুকের সঙ্গে তার কাজকে কাওয়ালির সঙ্গে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ও সংগীত বিন্যাসের সংযোগ ঘটিয়েছিল। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘নাইট সং’ অ্যালবাম গ্র্যামি মনোনয়ন পায় বেস্ট ওয়ার্ল্ড মিউজিক অ্যালবাম বিভাগে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘চেইন অব লাইট’ অ্যালবামটি ১৯৯০ সালে রেকর্ড করা হয়েছিল; দীর্ঘদিন অপ্রকাশিত থাকার পর সেটি পুনরুদ্ধার ও নতুনভাবে প্রকাশ করা হয়। এটি প্রমাণ করে, তার কয়েক দশক আগের পরিবেশনাও আজকের শ্রোতার কাছে সমান আবেদন তৈরি করতে পারে।
চলচ্চিত্রেও তার কণ্ঠ জায়গা করে নেয়। মার্টিন স্করসেসির ‘দ্য লাস্ট টেম্পটেশন অফ ক্রাইস্ট’ চলচ্চিত্রের সংগীতে তার কণ্ঠ ব্যবহৃত হয়। পরবর্তী সময়ে ‘ন্যাচারাল বর্ন কিলার্স’ এবং ‘ডেড ম্যান ওয়াকিং’-এর সাউন্ডট্র্যাকেও তার সংগীতের উপস্থিতি পাওয়া যায়। পিটার গ্যাব্রিয়েল, মাইকেল ব্রুক, জেফ বাকলি, পার্ল জ্যামের এডি ভেডার, এআর রহমান, জাভেদ আখতার— সবাই তার সঙ্গে কাজ করেছেন। ১৯৯৬ সালের গজল ‘আফরিন আফরিন’ তার অন্যতম জনপ্রিয় গান। ২০১৭ সালে কোক স্টুডিওতে মোমিনা মুহতেসান ও নুসরাতের ভাতিজা রাহাত ফতেহ আলী খান যখন গানটি নতুন করে পরিবেশন করেন, তা ইউটিউবে ৩৭০ মিলিয়নের বেশি ভিউ পায়।
পশ্চিমে বিটলস ও লেড জেপলিন যেমন প্রাসঙ্গিক, তেমনি নুসরাত ফতেহ আলী খানও ভারতীয় ও পাকিস্তানি সংগীতশিল্পীদের মধ্যে সচেতন-অবচেতনভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবেন। তার সংগীত সময়ের ঊর্ধ্বে, কখনো পুরনো হয় না
সুফি রক ব্যান্ড জুনুনের সালমান আহমেদের ভাষায়, ‘কাওয়ালির শাহেনশাহ নুসরাত তার গানের মাধ্যমে শ্রোতাকে এক অপার্থিব প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিকতার শীর্ষে নিয়ে যেতেন। তার ভয়েস ছিল পাভারোত্তির মতো বিস্তৃত; নিচু থেকে উচ্চ স্বরে যাওয়ার ক্ষমতা গায়ে কাঁটা দেয়। তার ছন্দ, পিচ আর কণ্ঠের আবেগ হৃদয় ছুঁয়ে যেত।’
সালমান আহমেদ আরও বলেন, ‘নুসরাতের স্ট্যামিনা ছিল অসাধারণ; গানের মানের সঙ্গে আপস না করেই সারারাত গান গাইতে পারতেন। তিনি ছিলেন সৃজনশীল ও অকুতোভয়। যে কারও সঙ্গে জ্যাম করতে পারতেন—সালমান আহমেদ হোক বা জেফ বার্কলি, তার কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল না।’
নুসরাত কাওয়ালিকে আধুনিক করেছিলেন, কিন্তু মূল কাঠামো অটুট রেখেছিলেন। উঠতি কাওয়ালি তারকা দুই ভাই জেইন ও জোহাইব আলী বলেন, আগের কাওয়ালরা একটি কাওয়ালি এক ঘণ্টার বেশি গাইতেন, অনুষ্ঠান চলত আট-নয় ঘণ্টা। কিন্তু ৮০ ও ৯০-এর দশকে নুসরাত উপলব্ধি করেন, মানুষের এত সময় নেই। তাই তিনি কাওয়ালিকে ১৫-২৫ মিনিটে নামিয়ে আনেন, যা কাওয়ালিকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ২০০১ অনুযায়ী, নুসরাত ১২৫টি অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন— কোনো কাওয়ালি শিল্পীর ক্ষেত্রে যা সর্বোচ্চ।
১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট লন্ডনের ক্রমওয়েল হাসপাতালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নুসরাত ফতেহ আলী খান। তার আগে তিনি কিডনি ডায়ালাইসিস করাতেন। সালমান আহমেদ স্মরণ করেন, মৃত্যুর এক মাস বা তার কিছু আগে একটি অনুষ্ঠানে নুসরাতকে সুস্থ মনে হয়নি। তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, নুসরাতের একটু বিশ্রাম নেওয়া উচিত।
কানাডীয় কম্পোজার মাইকেল ব্রুক বলেন, সংগীত ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকাকালে তিনি চলে গেলেন— এমন সময়, যখন দুজনের ফিউশন ভীষণ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছিল।
মৃত্যু কী আর নুসরাতকে থামাতে পেরেছে! তার প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের কাজে প্রবলভাবে দেখা যায়। তার ভাতিজা রাহাত ফতেহ আলী খান পারিবারিক ঐতিহ্য এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছেন। আরুজ আফতাবের মতো শিল্পীরা তাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে মানেন।
পশ্চিমে বিটলস ও লেড জেপলিন যেমন প্রাসঙ্গিক, তেমনি নুসরাত ফতেহ আলী খানও ভারতীয় ও পাকিস্তানি সংগীতশিল্পীদের মধ্যে সচেতন-অবচেতনভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবেন। তার সংগীত সময়ের ঊর্ধ্বে, কখনো পুরনো হয় না।
আজ তার জন্মদিনে তাই ভাষা নয়, কণ্ঠই কথা বলে। কাওয়ালির আধ্যাত্মিকতা, প্রার্থনার আবহ, গভীর ব্যক্তিগত আবেগ আর কণ্ঠের অসাধারণ বিস্ময়— সব মিলিয়ে নুসরাত ফতেহ আলী খান রয়ে গেছেন এমন এক শিল্পী হিসেবে, যার আবেদন কখনো না ‘ফুরায়’।









