আইনজীবীদের টানাটানিতে নাজেহাল আসামি
- সমস্যা সমাধানে বেগ পেতে হয় সমিতিকে
- শেষ দুই বছরে কমেছে অভিযোগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর শ্যামপুর থানায় ধর্ষণ মামলার আসামি মো. আসিফ। গত ৮ এপ্রিল ধার্য ছিল তার জামিন শুনানির দিন। হাজত থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় বেঁধেছিলেন বুক। অপেক্ষায় ছিলেন কখন উকিল এসে দেবেন সুখবর। সেই আশার গুড়ে বালি দিয়েছেন আইনজীবীরাই। কারণ, তার পক্ষে পৃথক দুটি ওকালতনামা জমা দেন হেলাল উদ্দিন আহমেদ ও ইমরান হোসেন। তাদের টানাটানিতে হয়নি শুনানি। জামিন মেলেনি আসামির। উল্টো, আইনজীবীর ঝামেলা মেটাতেই কেটে যায় কয়েক দিন।
বিষয়টি এতই জটিল হয়ে পড়েছিল যে, মীমাংসার জন্য যেতে হয়েছিল সমিতির কাছে। মামলাটি কোন আইনজীবী পরিচালনা করবেন— সেই সিদ্ধান্ত দিতে ঢাকা আইনজীবী সমিতিকে নির্দেশ দেন বিচারক। আইনজীবীদের মধ্যে মামলা নিয়ে টানাটানির ঘটনা এটিই প্রথম নয়, গত ছয় বছরে এমন সাড়ে পাঁচ হাজার ঘটনায় নাজেহাল হয়েছে হাজার হাজার আসামি।
একাধিক ওকালতনামায় কী সমস্যা হয়— জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান আগামীর সময়কে জানালেন, একই মামলায় একাধিক ওকালতনামা জমা হলে বিভ্রান্ত হন আদালত। এক্ষেত্রে কে প্রকৃত প্রতিনিধি (আইনজীবী), তা নির্ধারণে সমস্যা হয়, স্থগিত থাকে শুনানি। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়, বিশেষ করে হাজতে থাকা আসামিদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব গুরুতর। এ ধরনের সমস্যা নিরসনে ডিজিটাল ও ইউনিফর্ম ওকালতনামা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অন্য এক মামলায় দেখা যায়, সাথী আক্তারের করা যৌতুকনিরোধ আইনের মামলার আসামি তার স্বামী হাজারীবাগের আমির হামজা। ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে ছিল মামলাটি। ওইদিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবুজ্জামান নথিতে দেখতে পান, আসামির পক্ষে আইনজীবী মো. মনিরুজ্জামান ও আয়াতুল আল আমিনের দুটি আবেদন। মামলাটি কে পরিচালনা করবেন, সেই সিদ্ধান্তের জন্য বলা হয় সমিতিকে। পরে অবশ্য মনিরুজ্জামানই উকিল হিসেবে নির্দিষ্ট হন।
আরেকটিতে দেখা গেছে, তুরাগ থানার মানব পাচার আইনের মামলায় বন্দি ছিলেন সুইটি আক্তার। গত ২৬ মার্চ তার জামিন শুনানির দিন আলাদা ওকালতনামা জমা দেন আইনজীবী কাজী আকরামুল হুদা ও মো. শামসুজ্জোহা। একই কারণে শুনানি না হয়ে বেড়ে যায় হাজতির মুক্তির অপেক্ষা। পরে সমিতির সিদ্ধান্তে মামলাটি পরিচালনা করেন আকরামুল।
নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, এক আসামির পক্ষে একাধিক ওকালতনামা দাখিল হওয়াকে কেন্দ্র করে ২০২০ সালের ৩ মার্চ থেকে চলতি বছরের ৭ মার্চ পর্যন্ত ছয় বছরে ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে পাঠানো হয়েছে পাঁচ হাজার ৩৫৯টি খণ্ড নথি। পরে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে মামলার প্রতিনিধি নির্দিষ্ট করেন আইনজীবী সমিতির নেতারা। এর মধ্যে ২০২০ সালের ৩ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ৭ মার্চ পর্যন্ত ৯৭২টি, ২০২১ সালের ৮ মার্চ থেকে ২০২২ সালের ৬ মার্চ পর্যন্ত ১১৩৭টি, ২০২২ সালের ৭ মার্চ থেকে ২০২৩ সালের ৯ মার্চ পর্যন্ত ৮৯১টি, ২০২৩ সালের ১২ মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত ১০৩২টি, ২০২৪ সালের ১১ মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ পর্যন্ত ৬৪৮টি এবং ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ থেকে চলতি বছরের ৭ মার্চ পর্যন্ত ৬৭৯টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তির সংখ্যা তুলনামূলক বেশি ছিল। এর মধ্যে ২০২১-২২ সময়ে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৩৭টি আদেশ দেওয়া হয়। ২০২২-২৩ সময়ে এই সংখ্যা কমে ৮৯১টিতে নেমে এলেও ২০২৩-২৪ সময়ে আবার বেড়ে ১ হাজার ৩২টিতে পৌঁছায়। তবে সর্বশেষ দুই বছরে এই সংখ্যা কিছুটা কমেছে।
অভিযোগগুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে আদালতে তোলার নিয়ম থাকায় এত দ্রুত আইনজীবী ধরতে পারে না অনেক ভুক্তভোগী পরিবার। এই দুর্বলতার সুযোগ নেন কিছু আইনজীবী। তারা কাঠগড়ায় কাউকে তোলার খবর পেলেই তাৎক্ষণিক স্বাক্ষর নিয়ে ওকালতনামা জমা দেন। কিন্তু পরে যখন পরিবার কাউকে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেয়, তখনই শুরু হয় জটিলতা। পরে বিষয়টি সমাধানের জন্য পাঠানো হয় আইনজীবী সমিতির কাছে, যা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয় আসামির ভোগান্তি ও পরিবারের হয়রানি।
‘অল্পসংখ্যক আইনজীবী আছে, যারা আদালতের গারদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। অনেক সময় আসামির পরিবারের পরিচিত আইনজীবী থাকেন না— এই সুযোগ বুঝে এবং পুলিশের সহযোগিতায় গারদের ভেতর থেকে আসামির স্বাক্ষর করিয়ে নেন ওকালতনামায়। কিন্তু মামলার জন্য গারদের সামনে বা থানায় যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাদের কারণে বদনাম হয় পুরো আইনজীবী সমাজের। এজন্য আমাদের ‘টাউট’ উচ্ছেদ কমিটি আছে, বিভিন্ন সময় তাদের সোপর্দ করা হয় পুলিশে’— ব্যাখ্যা দিলেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নজরুল ইসলাম।








