নিয়মের বালাই নেই বালাইনাশক নিবন্ধনে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কৃষকের ফসল রক্ষায় ব্যবহৃত বালাইনাশকই ঝুঁকিতে ফেলছে প্রাণ-প্রকৃতি। একই সক্রিয় উপাদানের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বালাইনাশক নিবন্ধনের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও জলজ প্রাণীর ওপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পণ্যের গৌণ উপাদান ও ফর্মুলেশনের পার্থক্য বিবেচনায় না নিয়ে নিবন্ধন দেওয়া হলে মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর তৈরি হতে পারে অজানা ঝুঁকি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং প্রায় ১ হাজার ২৩০টি বালাইনাশক কোম্পানিকে আট হাজারের বেশি পণ্যের নিবন্ধন দিয়েছে। এসব পণ্যের বড় অংশই ‘মি-টু’ শ্রেণির, অর্থাৎ একই সক্রিয় উপাদান ব্যবহার করে বিভিন্ন কোম্পানির বাজারজাত করা আলাদা ব্র্যান্ড। সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষি খাতের চাহিদার তুলনায় একই ধরনের বালাইনাশকের ব্র্যান্ডের সংখ্যা অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বালাইনাশকের নিরাপত্তা শুধু সক্রিয় উপাদানের ওপর নির্ভর করে না। বাইন্ডার, অ্যাডজুভেন্ট, ফিলার, দ্রাবক, স্ট্যাবিলাইজার ও সারফ্যাকট্যান্টের মতো গৌণ উপাদানও ভূমিকা রাখে পণ্যের বিষাক্ততা এবং পরিবেশগত প্রভাব নির্ধারণে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব উপাদানের বিষাক্ততা মূল সক্রিয় উপাদানের চেয়েও বেশি হতে পারে।
ডিএইর উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান আইন ও বিধিমালায় বালাইনাশক নিবন্ধনের তিনটি শ্রেণি রয়েছে— নতুন সক্রিয় উপাদান বা ‘নিউ মলিকিউল’, ‘মি-টু প্রোডাক্ট’ এবং নতুন ফর্মুলেশনের বালাইনাশক।
দেশে আগে নিবন্ধিত হয়নি এমন সক্রিয় উপাদানের বালাইনাশক নিবন্ধনের ক্ষেত্রে রাসায়নিক বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ছাড়পত্রসহ একাধিক অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
তবে কোনো কোম্পানি একটি সক্রিয় উপাদান ও নির্দিষ্ট ফর্মুলেশনের বালাইনাশক নিবন্ধন পাওয়ার পর অন্য কোম্পানি একই সক্রিয় উপাদান দিয়ে ‘মি-টু’ পণ্যের নিবন্ধন চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর ও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নতুন করে ছাড়পত্র নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এক্ষেত্রে নিরাপত্তা যাচাইয়ের ঘাটতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, একই সক্রিয় উপাদান থাকলেও ব্র্যান্ডভেদে গৌণ উপাদান, ফর্মুলেশন ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় পার্থক্য থাকতে পারে। এতে মানুষের স্বাস্থ্য, মাটি, পানি, উপকারী পোকামাকড় ও জলজ প্রাণীর ওপর প্রভাবও ভিন্ন হতে পারে।
নতুন ফর্মুলেশনের বালাইনাশকের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন রয়েছে। এসব পণ্যের সক্রিয় উপাদান আগে নিবন্ধিত থাকলেও ফর্মুলেশনটি নতুন। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাসায়নিক বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার পর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক নয়। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাছের ওপর বিষাক্ততা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার ভিত্তিতে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মাছের বিষাক্ততা পরীক্ষা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মাটিতে রাসায়নিকের স্থায়িত্ব, পানিতে মিশে যাওয়ার প্রবণতা, অন্যান্য জলজ প্রাণী ও উপকারী কীটপতঙ্গের ওপর প্রভাব এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও মূল্যায়ন করা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান জানালেন, বালাইনাশক উৎপাদন একটি জটিল ও স্পর্শকাতর প্রক্রিয়া। বালাইনাশকের নিরাপত্তা মূল্যায়নে সক্রিয় উপাদানের পাশাপাশি ফর্মুলেশন, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, গৌণ উপাদান এবং পরিবেশগত প্রভাব সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমানে বালাইনাশক বিধিমালা সংশোধনের কার্যক্রম চলছে। নতুন বিধিমালায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হলে আইনগত জটিলতা থাকবে না।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোনমি বিভাগের ড. আহমেদ খায়রুল হাসান বলছিলেন, ‘শুধু নতুন সক্রিয় উপাদানের ক্ষেত্রে নয়, প্রতিটি বালাইনাশক নিবন্ধনের আগে পরিবেশ অধিদপ্তর ও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নিরাপত্তা মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা খুবই প্রয়োজন।’
সম্পূর্ণ ফর্মুলেটেড পণ্যের নিরাপত্তা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এ কে এম রাশিদুল আলম। তার মতে, গৌণ উপাদানের বিষাক্ততা, মাটিতে রাসায়নিকের স্থায়িত্ব, জলজ প্রাণী, মৌমাছি ও উপকারী পোকামাকড়ের ক্ষতি এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন জরুরি।
ডিএইর উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক ড. মোহাম্মদ এনায়েত-ই-রাব্বির ভাষ্য, নিবন্ধনের ক্ষেত্রে পণ্যের ফর্মুলেশন, গুণগত মান, ব্যবহারের উদ্দেশ্য, প্রয়োগের মাত্রা এবং মানুষ ও পরিবেশের সম্ভাব্য সংস্পর্শ বিবেচনা করা প্রয়োজন। ফর্মুলেশনের পার্থক্যে ঝুঁকি বদলাতে পারে বলে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত যাচাই করতে হবে। তবে বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক তথ্য যথেষ্ট হলে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে ঝুঁকিভিত্তিক মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
কৃষকের জন্য কার্যকর বালাইনাশক নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, একই সক্রিয় উপাদানের ভিন্ন ব্র্যান্ড ও নতুন ফর্মুলেশনের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা যাচাই নিশ্চিত করা গেলে সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।



