জ্বালানি তেলের দোহাই দিয়ে খুচরা বাজারে কারসাজি
- পরিবহন খরচের নামে দাম বাড়ল ১০-৩০ টাকা
- কাঁচা মরিচের দাম একলাফে আড়াইশ পার
- পটোল ৭০, লম্বা বেগুন বিক্রি ১০০-১১০ টাকায়
- ৫০ কেজির চালের বস্তায় বৃদ্ধি ১৫০-৩০০

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নতুন করে অস্থির হয়ে উঠেছে রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজার। পাইকারি ও দূরপাল্লার পরিবহনে প্রকৃত ব্যয় সামান্য বাড়লেও পাড়া-মহল্লা ও খুচরা বাজারে এসে মূল্য চড়ছে কয়েক গুণ। আড়ত ও দূরপাল্লার ট্রাকে যে পণ্য পরিবহনে কেজিতে খরচ বাড়ে ২০-৩০ পয়সা, খুচরা বাজারে পৌঁছাতে সেই একই পণ্যে ক্রেতাদের পকেট থেকে খসানো হচ্ছে অতিরিক্ত ১০-৩০ টাকা। মূলত সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে কারওয়ান বাজার, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীর পাইকারি এবং খুচরা বাজারে চাল, ডাল, সবজি, ডিম ও মাংসের দামে নতুন উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে— বলছে অনুসন্ধান।
উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকায় আসা ট্রাকচালকদের তথ্য বলছে, তেলের দাম বাড়ায় ট্রাকপ্রতি ভাড়া বেড়েছে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা। একটি ১০ হাজার কেজি সক্ষমতার ট্রাকে সবজি বা চাল আনলে প্রতি কেজিতে বাড়তি ব্যয় হয় সর্বোচ্চ ২০-৩০ পয়সা। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। ভোক্তার হাতে আসতে আসতে বাড়তি পরিবহন ও শ্রমিকের খরচের অজুহাতে এবং আড়তদারদের হাতবদলে দাম বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ।
সবজি ও চালের বাজারে অস্থিরতা: উৎপাদনস্থল থেকে ট্রাকে শাকসবজি ও খাদ্যপণ্য রাজধানীর আড়তে পৌঁছাতে যে খরচ বাড়ছে, তার পুরো বোঝা এসে পড়ছে সাধারণ ভোক্তাদের ঘাড়ে। খুচরা বাজারে দেখা গেল, গত সপ্তাহের তুলনায় সবজির দাম কেজিতে ১৫-৩০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি। কিছুদিন আগের ২২-২৫ টাকার আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ টাকায়। পটোলের কেজি উঠেছে ৭০ টাকায়, লম্বা বেগুন ১০০-১১০, গোল বেগুন ১৫০ এবং ঢেঁড়স ও ঝিঙে বিক্রি হচ্ছে ৬৫-৭৫ টাকায়। কাঁচা মরিচের বাজার সবচেয়ে চড়া, কেজিপ্রতি দাম একলাফে দাঁড়িয়েছে ২৪০-২৬০ টাকায়। অন্য সবজিতেও অস্বস্তি ঊর্ধ্বমুখী। প্রতি কেজি শিম ২০০ (আগে ১৬০-১৭০), টমেটো ১০০ (আগে ৮০-৯০), শসা ৬০, করলা ৭০, লাউ ৮০ ও মুলা ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ধুন্দল ৭০, বরবটি ৮০ এবং চালকুমড়া প্রতিটির দাম উঠেছে ৬০ টাকায়।
চালসহ নিত্যপণ্য: পরিবহন ব্যয়ের দোহাই দিয়ে ৫০ কেজির চালের বস্তায় ১৫০-৩০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন আড়তদাররা। মাঝারি মানের বিআর২৮ ও পাইজাম চালের কেজি এখন ৬২-৬৬ এবং মোটা চাল ‘স্বর্ণা’ বিক্রি হচ্ছে ৫৬-৫৮ টাকায়।
ডিম ও পোলট্রির বাজারেও অভিন্ন চিত্র। খামারের খাদ্য ব্যয় ও পরিবহন বাড়ার অজুহাতে এক ডজন লাল ডিমের দাম বেড়ে হয়েছে ১৬০-১৬৫ টাকা। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৯০-২০০ এবং সোনালি মুরগি ৩১০-৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজি ব্যবসায়ী কামাল ও পারভেজ আলীর মতে, মোকামে পণ্যের বাড়তি দামের পাশাপাশি কৃষক থেকে আড়ত পর্যন্ত পরিবহন ও শ্রমিক খরচ বাড়ায় বাধ্য হয়ে দাম বাড়াচ্ছেন তারা। তবে ক্রেতা মোহাম্মদ রকিব ও ফয়সাল জানালেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে সব পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ানো হচ্ছে, সাধারণ মানুষের সীমিত আয়ে তা সামলানো অসম্ভব। মিরপুর এলাকায় রিকশা চালিয়ে দিনে ৫০০-৬০০ টাকা আয় করেন শফিকুল ইসলাম। আগে এই আয় দিয়ে সংসার টেনেটুনে চললেও এখন চাল কিনতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে আয়ের বড় অংশ। সংসারের খরচ সামলাতে করতে হচ্ছে ঋণ। তিনি বললেন, ‘তেলের দাম বাড়লে বড় মানুষের কষ্ট হয় না, কষ্ট হয় আমাদের মতো গরিবের। ডিমের হালি এখন ৫০ টাকার নিচে মিলছে না। কাঁচা মরিচ কেনা অনেক আগেই বাদ দিয়েছি। আগে দুই তরকারি রান্না হতো, এখন এক পদ দিয়েই খাইতে হয়।’
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা ও বেসরকারি ব্যাংকের জুনিয়র কর্মকর্তা নাজমুল হাসান ৩৫ হাজার টাকা বেতনে চার সদস্যের পরিবার চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। সাশ্রয়ের আশায় কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে এসে তিনি জানালেন, বাসা ভাড়া, বাস ভাড়া ও বাজার খরচ সামলাতে গিয়ে বিপদে পড়েছেন তিনি।
‘আমরা মধ্যবিত্তরা না পারি কারও কাছে হাত পাততে, না পারি মুখ ফুটে কষ্টের কথা বলতে। আগে মাসে কাঁচাবাজারে ৮-৯ হাজার টাকা লাগত, এখন ১২ হাজার টাকায়ও হিসাব মিলছে না। বাধ্য হয়ে খাদ্যতালিকা থেকে মাছ-মাংস বাদ দিতে হচ্ছে’— দুর্দশা তুলে ধরলেন তিনি।



