বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস আজ
ঢাকার বুকে আসলে কত মানুষের বাস?

ভোরের আলো ফোটার আগেই কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে থামে তিতাস কিংবা তুরাগ এক্সপ্রেস। শীতের কুয়াশা কিংবা তপ্ত গ্রীষ্মের ধূলিমাখা সেই ট্রেন থেকে একদল মানুষ বুকভরা স্বপ্ন আর দুমুঠো ভাতের তাগিদে পা বাড়ায় ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায়। কেউ আসে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে, কেউবা আসে স্রেফ বেঁচে থাকার একবুক আশা নিয়ে। অন্নপূর্ণার মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এ মানুষগুলোই প্রতিদিন ব্যস্ত ঢাকার যানজটে ঠাসা রাস্তা, ঘিঞ্জি গলি আর বহুতল ভবনের ভিড়ে বিলিয়ে দেয় নিজেদের। কংক্রিটের এই ঢাকা আসলে কোনো সাধারণ শহর নয়; এটি কোটি হৃদয়ের এক জীবন্ত জনসমুদ্র। কিন্তু এই মেগাসিটিতে ঠিক কত কোটি মানুষ প্রতিদিন হাসে, কাঁদে কিংবা জীবনযুদ্ধে লড়ে। সেই সংখ্যার হিসাব খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এলো ভিন্ন ভিন্ন সমীকরণ আর চমকপ্রদ তথ্য। ঢাকার জনসংখ্যা আসলে কত— এই প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে জানতে হবে ‘তিন’ ঢাকা সম্পর্কে। এক. মেগাসিটি ঢাকা। দুই. ঢাকা জেলা এবং তিন. ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।
মেগাসিটি ঢাকা: জাতিসংঘের সবশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদন বলছে, ঢাকা মেগাসিটির জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ, যা প্রকাশ হয়েছে গত বছরের নভেম্বরে। এই হিসাব অনুযায়ী ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেগাসিটি। আর সবচেয়ে জনবহুল মেগাসিটি ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা। এই প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়েছে, ২০৫০ সালে জাকার্তাকে টপকে সবচেয়ে জনবহুল মেগাসিটির তালিকায় প্রথমে উঠে আসবে ঢাকা, যার জনসংখ্যা হবে প্রায় ৫ কোটি ২১ লাখ। ঢাকা মেগাসিটির জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ। কিন্তু এই মেগাসিটি কি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মিলে? নাকি ঢাকা জেলা মিলে? যদি এই দুটির একটির উত্তরও হ্যাঁ হয়, তাহলে বাকি প্রশ্নের উত্তর কোথায়? নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, আসলে মেগাসিটির কোনো নির্দিষ্ট প্রশাসনিক সীমানা নেই। ঢাকার যেখানে যেখানে নগর চরিত্র আছে, সেটিই ঢাকা মেগাসিটি বলে পরিগণিত হবে। তাহলে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জনসংখ্যা কত? জাতিসংঘ যখন কোনো শহরের জনসংখ্যা হিসাব করে, তখন তারা শুধু প্রশাসনিক সীমানা (যেমন সিটি করপোরেশন, জেলা) দেখে না। তারা ‘কন্টিগুয়াস আরবান গ্রিড’ বা নিরবচ্ছিন্ন শহুরে এলাকা বিবেচনা করে। যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে অন্তত ১ হাজার ৫০০ মানুষ থাকে। এই পরিমাপ অনুযায়ী ঢাকা মেগাসিটির মধ্যে সাভার, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুরের কিছু শিল্পাঞ্চল ও উপশহরগুলোও ঢুকে পড়ে। এসব এলাকা যখন ঢাকার সঙ্গে হিসাব করা হয়, তখন সেটি বৃহত্তর ঢাকা বা ঢাকা মেগাসিটি বলে পরিগণিত হয়।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জনসংখ্যা: প্রশাসনিকভাবে মূল ঢাকা শহর উত্তর ও দক্ষিণ— এ দুই সিটি করপোরেশনে বিভক্ত। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, এ দুই সিটির মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ। যেখানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জনসংখ্যা প্রায় ৫৯ লাখ ৯০ হাজার ৭২৩ জন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) এই সংখ্যা প্রায় ৪৩ লাখ ৫ হাজার ৬৩। তবে ঢাকার জনসংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে দুই সিটি করপোরেশনের নিজস্ব হিসাবে। আগে ঢাকার দুই সিটি তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে জনসংখ্যা উল্লেখ করলেও এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে সংস্থা দুটি। জনসংখ্যা নিয়ে এখন মৌখিক তথ্য রয়েছে সংস্থা দুটির কাছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম আগামীর সময়কে জানালেন, তাদের জনসংখ্যা আনুমানিক দেড় কোটি। আর উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বললেন, তাদের জনসংখ্যা ৫৯ লাখ (জনশুমারির তথ্য) বলে উল্লেখ করলেও ভাসমান জনগোষ্ঠী নিয়ে তা কোটির কাছাকাছি। নিজস্ব কোনো জরিপ না থাকলেও ঢাকার দুই সিটি তাদের জনসংখ্যার হিসাব সবসময়ই বাড়িয়ে বলে। বিভিন্ন সময় সেই বাড়তি জনসংখ্যার দোহাই দিয়ে সংস্থা দুটি মশক নিধনসহ নানান সেবামূলক কাজে ব্যাঘাত ঘটছে বলেও প্রচার করে।
ঢাকা জেলা: বিবিএস এবং জেলা প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যে ঢাকা জেলার আয়তন ১ হাজার ৪৬৩ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে মাত্র ৩০৫ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। বাকি প্রায় ১ হাজার ১৫৮ বর্গকিলোমিটারে রয়েছে ঢাকা জেলার পাঁচটি উপজেলা। ফলে ঢাকা জেলা বলতে দুই সিটি করপোরেশন ছাড়াও পাঁচটি উপজেলা বোঝায়। আর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী ঢাকা জেলার জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ। ফলে দুই প্রশাসকের দাবি অনুযায়ী ঢাকার দুই সিটির জনসংখ্যা কোনোভাবেই ২ কোটির বেশি হতে পারে না।
বছরে বাড়ে ৫ লাখ: ঢাকার জনসংখ্যা বাড়ছে তরতরিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করা না গেলে সংকট অনিবার্য। এজন্য টেকসই ও সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ আগামীর সময়কে বললেন, গ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। অনেকেই কাজের খোঁজে ঢাকায় আসেন। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা মানুষও এখন ঢাকামুখী। ফলে মেগাসিটি ঢাকায় প্রতি বছর ৫ লাখ করে নতুন মানুষ যুক্ত হচ্ছে। এতে নাগরিক সেবায় চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন নতুন নগরনীতি। ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা তৈরি করছে। ২০৫০ সালে যদি এই নগরের জনসংখ্যা ৫ কোটি ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সেটি রাজধানীর জন্য ‘মানব বোমা’য় রূপ নেবে বলেও উল্লেখ করলেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ। সংকট সমাধানে সরকারকে এগিয়ে এসে টেকসই ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ অধ্যাপক আকতার মাহমুদের।




