বিমানবন্দর রেলস্টেশনে পাঁচ মিনিটের যন্ত্রণা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকতেই বদলে গেল দৃশ্য। অপেক্ষমাণ যাত্রীরা ছুটলেন দরজার দিকে। কারও হাতে লাগেজ, কারও কোলে শিশু। কেউ নামছেন, কেউ উঠছেন। দরজার সামনে মুহূর্তেই জটলা। পেছন থেকে চাপ, সামনে জায়গা নেই। এর মধ্যেই হুইসেল।
আসন খোঁজার সুযোগ নেই। যে দরজা সামনে, সেখান দিয়েই উঠে পড়তে হচ্ছে। অনেকে উঠছেন অন্য বগিতে। পরে নিজের আসনে পৌঁছাতে আবার ভিড় ঠেলে এগোতে হচ্ছে। লাগেজ, শিশু আর দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী পেরিয়ে কারও কারও ১ ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়। ট্রেন অবশ্য অপেক্ষা করে না।
ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের এই ৫ মিনিটের বিরতিই এখন যাত্রীদের বড় ভোগান্তির কারণ। তাদের অভিযোগ, এত অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপদে ওঠানামা সম্ভব নয়। দাবি— বিরতি অন্তত ১০ মিনিট করা হোক।
স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী জহিরুল ইসলাম বললেন, ‘ট্রেন থামার পর মনে হয় ধরতে যাচ্ছি, উঠতে যাচ্ছি নয়। সবাই একসঙ্গে উঠছে। নিজের বগি পর্যন্ত যেতে পারব কি না, সেটাই চিন্তা।’
খিলক্ষেতের বাসিন্দা কামাল হোসেনের কাছে সমস্যাটি আরও বাস্তব। বিমানবন্দর স্টেশন তার বাড়ির কাছেই। তবু ভিড়ের কারণে অনেক সময় তাকে কমলাপুরে যেতে হয়। তার ভাষায়, ‘কমলাপুরে গেলে একটু সময় নিয়ে উঠতে পারি। কিন্তু আমাদের বাসা খিলক্ষেতের দিকে। এখান থেকে উঠতে সুবিধা হওয়ার কথা। অথচ এখানে উঠতেই এত চাপ যে, অনেক সময় কমলাপুরে চলে যাই।’
এতে বাড়তি সময় ও খরচ দুটোই হচ্ছে। যানজট পেরিয়ে কমলাপুর যেতে হচ্ছে। সড়কে বাড়ছে গাড়ির চাপ, নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা ও জ্বালানি। অথচ বিমানবন্দর স্টেশনটি উত্তর ও পূর্ব ঢাকার মানুষের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক রেলপথের একটি।
শুধু ওঠার সমস্যাই নয়, টিকিট নিয়েও অভিযোগ আছে। অনেক ক্ষেত্রে কমলাপুরের চেয়ে বিমানবন্দর থেকেই বেশি যাত্রী ট্রেনে ওঠেন। অথচ ঢাকার বাইরে যাওয়ার অনেক ট্রেনের টিকিট অনলাইনে বিমানবন্দর স্টেশনের জন্য বরাদ্দ থাকে না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই স্টেশন ব্যবহার করেও যাত্রীরা পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছেন না।
যাত্রীদের বক্তব্য, সমাধান খুব কঠিন নয়। ট্রেনকে আরও ৫ মিনিট সময় দিলেই ভিড় অনেকটা কমবে।
উত্তরার বাসিন্দা অনীল কুমার কুলিয়ারচর যাবেন। তার প্রশ্ন, ‘১০ মিনিট দাঁড়ালে রেলের খুব বেশি কি ক্ষতি হবে? আমরা তো আর সারা দিন ট্রেন দাঁড় করিয়ে রাখতে বলছি না। অন্তত যারা বিমানবন্দর থেকে উঠবেন, তারা যেন ধাক্কাধাক্কি ছাড়া উঠতে পারেন।’
কিন্তু রেলওয়ের হিসাব ভিন্ন। তারা বলছে, কমলাপুর থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৪০টি ট্রেন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যায়। এর মধ্যে প্রায় ১৬টি নারায়ণগঞ্জ রুটে এবং ১২টি পদ্মা সেতু হয়ে চলাচল করে। বাকি ১১২টি বিমানবন্দর স্টেশন হয়ে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। এই বিপুল ট্রেন চলাচলের কারণে বিমানবন্দরে কয়েক মিনিটের বাড়তি বিরতিও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
কমলাপুরে একসঙ্গে আটটি প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেন ছাড়তে পারে। ফলে একটি ট্রেন ছাড়ার পর পরের ট্রেনকে জায়গা দেওয়ার সুযোগ থাকে। বিমানবন্দরের পরিস্থিতি ভিন্ন। ঢাকার বাইরে যাওয়ার পথে ট্রেনগুলোকে মূলত একটি প্রধান লাইনের ওপর দিয়ে চলতে হয়। একটি ট্রেন বেশি সময় দাঁড়ালে পেছনের ট্রেনের জন্য জায়গা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্ল্যাটফর্ম ব্যস্ত থাকলে পেছনের ট্রেনকে আউটারে অপেক্ষা করতে হয়। একটি ট্রেনের ৫ মিনিট বাড়তি বিরতি তখন পরের ট্রেনের অপেক্ষা বাড়াতে পারে। সেই বিলম্ব ছড়িয়ে যেতে পারে আরও পেছনের ট্রেনেও।
সমস্যা শুরু হচ্ছে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই। কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্ধারিত সময় ২৭ মিনিট। বাস্তবে অনেক ট্রেনের সময় লাগে ৩৫-৪৫ মিনিট পর্যন্ত। বিশেষ করে তেজগাঁও এলাকায় বাড়তি সময় লাগছে। এরপর বিমানবন্দরে যাত্রী ওঠাতে দেরি হলে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন চাপ।
রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মতে, কাগজে ৫ মিনিটের বিরতি থাকলেও বাস্তবে যাত্রী ওঠানামা শেষ করতে অনেক সময় ১০-১২ মিনিট লেগে যায়। আনুষ্ঠানিকভাবে সময় ১০ মিনিট করলে সেটি বাস্তবে আরও বাড়তে পারে। তখন একাধিক ট্রেনের সূচি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
অর্থাৎ রেলওয়ের আপত্তি যাত্রীকে সময় না দেওয়ার জন্য নয়; সমস্যা অবকাঠামো ও পরিচালনব্যবস্থায়।
বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে বিরতি বাড়ানো যেতে পারে। তবে স্থায়ী সমাধান চাইলে স্টেশনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন চালু হলে একাধিক ট্রেন একই সময়ে স্টেশনে ঢোকা সুযোগ তৈরি হবে। একটি ট্রেনে যাত্রী ওঠার সময় অন্য ট্রেনকে আউটারে আটকে থাকতে হবে না।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেনের মতে, যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে ট্রেনে ওঠার জন্য যতটা সময় প্রয়োজন, ততটাই দেওয়া উচিত। এটি যাত্রীর অধিকার। তাই বিমানবন্দর স্টেশনের সংকট আসলে ৫ মিনিটের নয়। সংকটটি সক্ষমতার। যাত্রীর জন্য বাড়তি ৫ মিনিট মানে নিরাপদে ট্রেনে ওঠা, নিজের আসনে পৌঁছানো কিংবা কমলাপুর পর্যন্ত যানজট পেরিয়ে না যাওয়া। রেলওয়ের জন্য একই ৫ মিনিট মানে পেছনের ট্রেনের অপেক্ষা, আউটারে জট এবং সময়সূচিতে বাড়তি চাপ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমাধানও তাই দুদিক একসঙ্গে বিবেচনা করেই করতে হবে। শুধু ট্রেনের বিরতি বাড়ালে হবে না, বাড়াতে হবে স্টেশনের ধারণক্ষমতা ও পরিচালন সক্ষমতা। তৃতীয়-চতুর্থ লাইন চালু, টিকিট বরাদ্দে বিমানবন্দরকে গুরুত্ব দেওয়া এবং যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থাপনা উন্নত করাই হতে পারে সেই পথ। না হলে ৫ মিনিটের এই দৌড় চলতেই থাকবে— যাত্রীরা ছুটবেন ট্রেন ধরতে, আর রেলওয়ে ছুটবে সময়সূচি সামলাতে।



