ঢাকাডুবির হাজার কোটির জলকাব্য
- খাল উদ্ধারে ৫ বছরে দুই সিটির ব্যয় ১ হাজার ৭৯৩ কোটি
- জলাবদ্ধতা নিরসনে ৬ বছরে দুই সিটির বরাদ্দ ৭০৮ কোটি ১৩ লাখ
- এ সময়ে দুই খাতে রাজধানীর পানি সরাতে বরাদ্দ আড়াই হাজার কোটি

ছবি: আগামীর সময়
এদেশে এক শহর আছে— বর্ষা নামলেই যার রাস্তাগুলো নদী হয়, মোড়গুলো পুকুর হয়, মানুষ হয় ক্ষণিকের মাঝি। আর পত্রিকার শিরোনাম হয় ‘ঢাকাডুবি’। অথচ এই শহরকে ডুবতে না দিতে বছরের পর বছর খরচ হচ্ছে হাজারো কোটি টাকা। কাগজে আঁকা হয়েছে পরিকল্পনা, বাজেটে বেড়েছে অঙ্ক, উদ্বোধন হয়েছে নানা কর্মসূচির। শুধু বদলায়নি একটাই দৃশ্য— বৃষ্টি হলেই থইথই পানি।
এই তো গত শনিবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার সন্ধ্যা ৬টা। ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে ১৭৫ মিলিমিটার। এতেই রাজধানীর দুই সিটি উত্তর থেকে দক্ষিণ— অধিকাংশ সড়ক পানির নিচে। কোথাও বাস বন্ধ, কোথাও গাড়ি বিকল, কোথাও মানুষ কোমর পানি ঠেলে বাড়ি ফিরছে। কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবন যেন কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই থমকে গেল।
অথচ পাঁচ বছরে শুধু খাল, স্টর্ম ওয়াটার ড্রেন, নর্দমা পরিষ্কার, পাম্প হাউজ রক্ষণাবেক্ষণ, লেক উন্নয়ন ও কালভার্ট সংস্কারের মতো কাজে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ব্যয় করেছে ১ হাজার ৭৯৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর বাইরে ছয় বছরে জলাবদ্ধতা নিরসনের নামেই বরাদ্দ হয়েছে আরও প্রায় ৭০৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ, দুই খাত মিলিয়ে রাজধানীর পানি সরানোর কাজে বরাদ্দ হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। কখনো এই বাজেটের বাইরেও নানা খাতে খরচ করেছে সংস্থা দুটি। তবু কয়েক ঘণ্টার মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিতেই ডুবে যায় পুরো শহর। তাই প্রশ্নটা নতুন নয়; বরং প্রতি বর্ষাতেই ফিরে আসে— এত টাকা গেল কোথায়?
উত্তরে বাজেট বেড়েছে, পানি কমেনি
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের হিসাব বলছে, ২০২০ সালের পর খাল, ড্রেন, পাম্প হাউজ, নর্দমা পরিষ্কার, লেক উন্নয়ন ও কালভার্ট মেরামতে ব্যয় হয়েছে ১৭১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যয় ছিল ১২ কোটি ৭২ লাখ টাকা। পরের বছর ২৩ কোটি ১৮ লাখ, এরপর ১৩ কোটি ৬০ লাখ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৪৭ কোটি এবং সর্বশেষ অর্থবছরে পৌঁছে যায় ৭৫ কোটিতে।
অন্যদিকে, শুধু জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য গত ছয় বছরে উত্তর সিটি ব্যয় করেছে ২৭৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। দুই খাত মিলিয়ে উত্তর সিটির বাজেট-ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৪৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর বাইরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে আরও কোটি কোটি টাকা। তবু শনিবার রাতের বৃষ্টিতে উত্তর ঢাকার প্রধান সড়কগুলোর অধিকাংশই ডুবে যায় পানিতে।
দক্ষিণে অঙ্ক আরও বড়, ফল একই
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন খাল উদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ তৈরির নামে পাঁচ বছরে বরাদ্দ করেছে ১ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। শুধু ২০২২-২৩ অর্থবছরেই এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭১ কোটি টাকা। এর পরের বছরগুলোয়ও শত শত কোটি টাকার বাজেট ছিল।
এর সঙ্গে ছয় বছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে আরও ৪৩০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছে সংস্থাটি। সব মিলিয়ে ২০২০ সালের পর দক্ষিণ সিটির মোট বাজেট-ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। কিন্তু এত অর্থ ব্যয়ের পরও বাস্তবতা বদলায়নি। বর্ষার প্রথম বড় বৃষ্টিতেই দক্ষিণ ঢাকার অসংখ্য এলাকা পরিণত হয় জলমগ্ন নগরীতে।
কাগজে পরিকল্পনা, মাঠে পানি
নগর-পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় খাল উদ্ধার, দখলমুক্ত করা এবং নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার রাখা। কিন্তু বাস্তবে সেই কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাজেটের অঙ্ক।
নগর-পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেছেন, ঢাকার ভবিষ্যৎ নাকি ‘উজ্জ্বল’। তার ভাষ্য, এত বছরে দুই সিটি করপোরেশন একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানও তৈরি করতে পারেনি। ২০১৫ সালে ঢাকা ওয়াসা যে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছিল, সেটিও কার্যকরভাবে গ্রহণ করা হয়নি।
তিনি মনে করিয়ে দেন, ১৯৯৫ সালের ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানে কোথায় জলাশয় থাকবে, কোথায় ড্রেন হবে, কোন খাল দখলমুক্ত রাখতে হবে— সবই স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনাও কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে।
ড. আদিলের মতে, ঢাকার জলাশয় ও খোলা মাটি হারিয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নামার পথ নেই। ফলে শুধু বাজেট বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইন প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
খালের চেয়ে উদ্বোধনে বেশি ব্যস্ততা
নগর-পরিকল্পনাবিদদের অভিযোগ, বর্ষার আগে খাল পরিষ্কার ও দখলমুক্ত করার বদলে দুই সিটি করপোরেশন সময় ব্যয় করেছে নানা উদ্বোধন, মতবিনিময় সভা, ক্লিন ডে, অ্যাপ চালু, বৃক্ষরোপণ, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে।
তাদের দাবি, এ সময় যদি খাল, ড্রেন ও জলনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যয় করা হতো, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।
অভিযোগ রয়েছে, গত মার্চের পর দক্ষিণ সিটির প্রশাসককে জিয়া সরণির খাল ছাড়া অন্য কোনো খালের কার্যক্রমে তেমন দেখা যায়নি। তবে ধানমন্ডি লেকে উচ্ছেদ অভিযানে তিনি কয়েকবার গিয়েছেন। ধানমন্ডিতে মন্ত্রী-এমপিরা সকালে হাঁটতে বের হন বা তাদের নজরে আসবে বলে সব কাজ এই এলাকাকে কেন্দ্র করেই হয় ঢাকা দক্ষিণে। বর্ষার আগে গত এপ্রিল থেকে তিন মাস খালের পাড়ে দেখা যায়নি প্রশাসক মো. আব্দুস সালামকে। এখন জলাবদ্ধতায় তিনি নগরবাসীকে বলেছেন ‘ধৈর্য ধরতে’। উত্তর সিটিও একই কাজ করেছে। এই উৎসব, সেই উদ্বোধন— এ করেই সময় পার। মাসে একদিন খালপাড়ে মিডিয়া ডেকে উচ্ছেদ অভিযান। তারপর আর দেখা নেই প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানের। হঠাৎ করে আরেক দিন আরেক জায়গায় গিয়ে আরেক কর্মসূচি। এ করেই সময় কাটছে ঢাকার দুই প্রশাসকের।
১৪১ হটস্পটও রক্ষা করতে পারেনি শহর
এ বছর দুই সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতার ১৪১টি হটস্পট চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই তালিকা কোনো কাজে আসেনি। কারণ, পরিকল্পনাবিদদের ভাষায়, শুধু জায়গা চিহ্নিত করলেই হয় না— বর্ষার আগেই সেখানে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হয়। সেটি না হওয়ায় এবারও কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবে গেছে প্রায় পুরো ঢাকা। হাজার কোটি টাকার হিসাব তাই কাগজে রয়ে গেছে। বাস্তবে শহর বদলায়নি, বদলেছে শুধু বাজেটের অঙ্ক।







