জলাবদ্ধতায় দুই সিটির দুই সুর
দক্ষিণের বার্তা ‘ধৈর্য ধরুন’, উত্তরের পরামর্শ ‘টিমকে জানান’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রবিবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৬ ঘণ্টায় রাজধানীতে ৮২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আর সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৯৭ মিলিমিটার। এতেই ডুবে গেছে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বিস্তীর্ণ এলাকা। জলমগ্ন হয়ে পড়েছে দোকানপাট ও সড়ক। চরম দুর্ভোগে পড়েছে কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবন।
এমন পরিস্থিতি নগরবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রশাসক। অন্যদিকে কুইক রেসপন্স টিমকে জানাতে বলেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) প্রশাসক।
প্রতিবছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বর্ষা মৌসুমকে কেন্দ্র করে জলাবদ্ধতার হটস্পট নির্ধারণ করে। এবারও মোট ১৪১টি হটস্পট নির্ধারণ করেছে সংস্থা দুটি। এর মধ্যে ডিএসসিসির নিউ মার্কেট, নায়েম সড়ক, গ্রিন রোড, শান্তিনগর, মুগদা মেডিকেল, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, পুরান ঢাকা, মাজেদ সরদার রোড এবং পশ্চিম মালিবাগ-রাজারবাগসহ মোট ৩৩টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ হটস্পট চিহ্নিত করেছে।
অন্যদিকে, রাজধানীর জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ডিএনসিসি ১০৮টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ হটস্পট চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে বিমানবন্দর সড়ক, খিলক্ষেত, ব্যাপারীপাড়া, মধ্যপাড়া, নামাপাড়া, কুড়িল, কালশী রোড, মিরপুর-১২-এর মুসলিম বাজার, মিরপুর-১০ গোলচত্বর, মিরপুর-১১, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে, শাহীনবাগ ও বিজয় সরণি অন্যতম।
তবে গতকাল থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টিপাত দুই সিটির এসব হটস্পটকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। হটস্পটের বাইরেও দক্ষিণ সিটির অসংখ্য এলাকায় পানি জমেছে। আর এই জলজটের উচ্চতা ছিল এলাকাভেদে ৮ ইঞ্চি থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত। ফলে এই জলজট নিরসনে নাকানিচুবানি খাচ্ছে সংস্থাটির প্রশাসন থেকে শুরু করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ। ঢাকা উত্তর সিটির অবস্থা আরও ভয়াবহ।
বনানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার র্যাম্পের গোড়ায় জমে থাকা বিশাল জলরাশি দেখে যে কেউ একে সমুদ্র ভেবে ভুল করতে পারেন। একই অবস্থা বিমানবন্দর সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টেও। পুরো বর্ষাকালে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে এখানে হয়তো একসময় বিমানের পরিবর্তে জাহাজ ভেড়ানোর জেটি বানাতে হবে সরকারকে। ঘটনাস্থলে থাকা একজন প্রতিবেদক এমন মন্তব্য করেছেন।
এদিকে, রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পাম্পের মাধ্যমে পানি খাল ও নদীতে সরিয়ে নেয়। সংস্থাটির মোট তিনটি পাম্প রয়েছে। কমলাপুর টিটিপাড়া, ধোলাইখাল ও হাতিরঝিল—এই তিনটি আউটলেটের মাধ্যমে ১০৯ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন করা যায়। তবে এবার সংকট অন্য জায়গায়।
সংস্থাটি বলছে, ভারী বর্ষণে খাল ও নদীর পানির স্তর বেড়ে যাওয়ায় পাম্পের মাধ্যমে পানি অপসারণে বেগ পেতে হচ্ছে। তাদের মতে, ১১টি পাম্প স্টেশন থাকলে জলবদ্ধতা নিরসন অনেকটাই সহজ হতো।
অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটির জলাবদ্ধতা নিরসনে ১০টি অঞ্চলে ২১টি কুইক রেসপন্স টিম কাজ করছে। এ ছাড়া মিরপুর ও কল্যাণপুরসহ জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে মোট পাঁচটি স্থায়ী সেচ পাম্প সচল রয়েছে। এর বাইরে তাৎক্ষণিক ও জরুরি ভিত্তিতে জলাবদ্ধতাপ্রবণ নিচু এলাকাগুলোর পানি সেচের জন্য দুই সিটির কাছেই কিছু পোর্টেবল পাম্প রয়েছে। তবুও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না নগরবাসী।
সকাল থেকে জলাবদ্ধতার চিত্র দেখতে মাঠে রয়েছেন ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। তিনি বলেছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সিটি করপোরেশন। তবে ওয়াসা ও তিতাসের কিছু রাস্তা খননের কাজ চলমান থাকায় পানির নিচে কাজ করতে বেগ পেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় তিনি নগরবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, এক লিখিত বার্তায় ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, জলবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের টিম কাজ করছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণেই এই জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোনো জরুরি সমস্যা দেখা দিলে নগরবাসীকে সংশ্লিষ্ট টিমকে অবহিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নগরবিদরা বলছেন, ভারী বৃষ্টির সময় সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে লোক-দেখানো কিছু কাজ করে, যা স্থায়ী সমাধান নয়। খাল উদ্ধার এবং ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না।




