রেলগেটে দাঁড়াতেই প্রস্তাব, ‘বাবা লাগবে কয়টা?’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কারওয়ান বাজার রেলগেট। সামনে মাত্র দু-এক মিনিট। মানুষের ভিড়, ট্রেনের শব্দ, যানবাহনের হর্ন। এর মধ্যেই একজন এগিয়ে এসে জানতে চাইলেন, ‘বাবা লাগবে কয়টা?’ কোনো উত্তর না দিলে— তিনি সরে যাবেন। আর আগ্রহ দেখালেই কয়েক কদম দূরে নিয়ে শুরু হবে দরদাম। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাতবদল হবে ইয়াবা কিংবা গাঁজা।
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এই এলাকায় এমন দৃশ্য স্থানীয়দের কাছে নতুন নয়। দিনের আলো হোক কিংবা রাত, রেলগেট ও রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় এভাবেই চলে মাদক কেনাবেচা। সবচেয়ে বিস্ময় হচ্ছে—এসব ঘটছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, সম্ভাব্য ক্রেতা শনাক্ত করতে রেলগেট এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অবস্থান করেন মাদক বিক্রেতারা। কাউকে দেখলেই ভেসে আসে সেই পরিচিত প্রশ্ন, ‘বাবা লাগবে কয়টা?’ আগ্রহ প্রকাশ করলেই শুরু হয় যোগাযোগ। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হয় লেনদেন। পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই স্বাভাবিকভাবে ঘটে যে, আশপাশের মানুষের অনেকেই যেন এতে অভ্যস্ত।
দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বসবাস করছেন এমন একজন জানান, মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালিত হলেও সেটি স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। কয়েকদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন মাদক কারবারিরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় আরেক বাসিন্দার মতে, মাদকের এই অবাধ বেচাকেনা শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি পুরো এলাকার নিরাপত্তা ও সামাজিক পরিবেশের জন্যও হুমকি। কিশোর-তরুণদের মাদকে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা যেমন বাড়ছে, তেমনি ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দৃশ্যমান উপস্থিতির বাইরে পুরো চক্রটিকে আইনের আওতায় আনা না গেলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না।
লাভের বড় ভাগ যায় মালিকের পকেটে
প্রকাশ্য এই মাদক ব্যবসা আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন অন্য একজন। রেললাইনের বিক্রেতারা যাকে ডাকেন ‘মালিক’। লাভের অধিকাংশই যায় সেই মালিকের পকেটে। রেলগেটের এক মাদক কারবারির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘আমরা পেটের জন্য মালিকের হয়ে কাজ করি।’ তার ভাষ্য, বিক্রির পর লাভের টাকার সামান্য অংশই তারা পান। প্রায় পুরো টাকাই যায় মালিকের পকেটে।’
পুলিশের অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদক বিক্রেতা জানান, পুলিশ মাঝেমধ্যেই অভিযান চালায় এবং গ্রেপ্তার করে। ঠিক সে সময়ে তিনি আরেক মাদক কারবারিকে দেখিয়ে বললেন— ‘দীর্ঘদিন জেলে থাকার পরে আমার এই ছোট ভাই গতকাল ছাড়া পেয়েছে।’
কথা হয় এক মাদক ক্রেতার সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানালেন, যাতায়াতের পথে এখান থেকে সহজেই বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ মাদক কেনা যায়। যারা মাদক সেবন করেন, তারা এখান থেকেই সংগ্রহ করেন।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি মাহবুবুর রহমান বলেছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কিংবা তথ্য পেলে আমরা অভিযান পরিচালনা করি এবং মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করি। প্রতি মাসেই ২০ থেকে ২৫টি মাদক মামলা হয়। অনেকেই আদালত থেকে জামিন পেয়ে আবার মাদক ব্যবসায় যুক্ত হয়।
‘রেললাইন এলাকা রেলওয়ে পুলিশের আওতাধীন। এ ছাড়া মাদক নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং পুলিশের গোয়েন্দা শাখাও কাজ করছে’—যোগ করেন ওসি।
পুলিশের উপস্থিতিতেই মাদক বিক্রি— এ বিষয়ে ওসি বললেন, ‘যদি কোনো পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতে মাদক লেনদেন হয়ে থাকে এবং তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাই, তাহলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এই পথে যাতায়াত করা একাধিক যাত্রী জানান, রাজধানীর এমন জনবহুল স্থানে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হচ্ছে। প্রশাসনের উচিত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান।





