যুবদল নেতা বাবুকে হত্যার টার্গেটে দুদিন অনুসরণ
- চার শুটারই গ্রেপ্তার
- হত্যার নেপথ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার নাম
- চার শুটারকে ভাড়া করেন যুবদলের এক কর্মী
- কয়েক কোটি টাকার চাঁদাবাণিজ্যের অভিযোগ স্থানীয়দের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর মিরপুরে কাফরুল যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করে দুদিন ধরে অনুসরণ করেছিল চার ভাড়াটে শুটার। তবে দুই দিন সুযোগ না পাওয়ায় শুক্রবার রাতে আবারও হামলার চেষ্টা চালানো হয়। এ সময় সন্দেহজনক গতিবিধি দেখে স্থানীয় যুবদলকর্মীরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ নিহত হন এবং আরও দুজন আহত হন। এ ঘটনায় চার শুটারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হত্যার পরিকল্পনার নেপথ্যে উঠে এসেছে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার নাম। চার শুটারকে ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় আনার দায়িত্বে ছিলেন যুবদলের এক কর্মী। পুলিশ বলছে, মূল পরিকল্পনাকারীকেও রাখা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিতে এবং যে কোনো সময় গ্রেপ্তার করা হতে পারে তাকে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে সোমবার সংবাদ সম্মেলনের আহ্বান করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম।
গত শুক্রবার রাত সোয়া ১১টার দিকে রাজধানীর মিরপুর-১৩ নম্বরের সি ব্লকের ১ নম্বর সড়কে ওপেক্স গার্মেন্টসের দক্ষিণ পাশের সড়কে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ। আহত হন সবজি বিক্রেতা নালাম সরদার ও যুবদল কর্মী মনির হোসেন। তাদের মধ্যে নালাম সরদারের অবস্থা সংকটাপন্ন।
ঘটনার পর নিহতের ভাই মাসুদ রানা কাফরুল থানায় হত্যা মামলা করেন। ঘটনার দিনই পথচারীরা চঞ্চল মোল্লা নামে এক শুটারকে আটক করে তুলে দেন পুলিশের হাতে। বর্তমানে তিন দিনের রিমান্ডে রয়েছেন তিনি। পরে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া চার শুটারই এখন পুলিশের হেফাজতে।
অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে ঘটেছে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও কিছু দিক তদন্তের এখনো বাকি রয়েছে।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে স্থানীয় ৪ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়াকে কেন্দ্র করে হাফিজুল ইসলাম বাবুর সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার বিরোধ ছিল। ওই বিরোধে স্থানীয় যুবদলের আরেক নেতা যুক্ত হয়ে বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে উঠে এসেছে তদন্তে। এ উদ্দেশ্যে যুবদলের এক কর্মীর মাধ্যমে ঝিনাইদহ থেকে চার শুটারকে ঢাকায় আনা হয়।
তদন্তে জানা গেছে, গত বুধবার চার শুটার ঢাকায় এসে মিরপুর-১০ নম্বরের একটি হোটেল এবং যুবদলের এক নেতার বাসায় অবস্থান নেয়। সেদিন থেকেই হাফিজুল ইসলাম বাবুকে অনুসরণ শুরু করে তারা। স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মীও তাদের সহযোগিতা করেন বলে তদন্তকারীদের ধারণা। বুধবার ও বৃহস্পতিবার হামলার সুযোগ না পেয়ে শুক্রবার রাতে বাবু যেখানে নিয়মিত আড্ডা দিতেন সেখানে অবস্থান নেয় তারা। প্রায় আধাঘণ্টা ঘোরাফেরার পর কয়েকজন যুবদলকর্মীর সন্দেহ হলে তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেন শুটারদের। তখন দুর্বৃত্তরা গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। এলোপাতাড়ি গুলিতে ইউসুফ আলী পারভেজ নিহত হন এবং নালাম সরদার ও মনির হোসেন আহত হন।
গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের এক যুগ্ম আহ্বায়কের নাম তদন্তে বারবার উঠে আসছে। তার সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার পর থেকে তাকে প্রকাশ্যে পাওয়া যাচ্ছে না এবং তার মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে। তবে একটি সূত্রের দাবি, বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পুলিশ।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, কাউন্সিলর নির্বাচন ছাড়াও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্পত্তি দখল, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ এবং বিভিন্ন আর্থিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে হাফিজুল ইসলাম বাবুর সঙ্গে দলের অন্য নেতাকর্মীদের বিরোধ ছিল। হোপ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সামনের ফুটপাতসহ কাফরুল ও ভাসানটেক এলাকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দোকান বসানোকে কেন্দ্র করে নিয়মিত অর্থ আদায় নিয়েও বিরোধের কথা জানিয়েছেন তারা। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব এলাকা থেকে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকার চাঁদাবাণিজ্য পরিচালিত হয়।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ফুটপাত ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায়ের নিয়ন্ত্রণ নতুন করে ভাগাভাগি হয়। এলাকার বিভিন্ন অংশের নিয়ন্ত্রণ পৃথক রাজনৈতিক নেতা ও তাদের অনুসারীদের হাতে চলে যায়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার রাকিব খান বলেন, ‘শুটার সবাই গ্রেপ্তার। হত্যার মোটিভও জানা গেছে। আরও কাজ করার বাকি আছে। ফলে তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে এখনও কিছু বলা যাচ্ছে না।’




