চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা নিয়ে প্রশ্ন, লাভের হিসাব দেখানোর দাবি

জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত আলোচনা সভা। ছবি : আগামীর সময়
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শ্রমিক ও পেশাজীবী নেতারা।
তাদের দাবি, বিদেশি অপারেটরের হাতে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব গেলে দেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দিলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে কীভাবে লাভবান হবে, তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তারা।
আজ শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি–সিসিটি ইজারা: বাংলাদেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলা হয়। সভার আয়োজন করে বন্দর রক্ষা ও করিডর বিরোধী আন্দোলন এবং বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম।
লিখিত বক্তব্যে বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রামের আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু এবং অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার। এনসিটি ও সিসিটি দেশীয় জনবল দিয়েই দীর্ঘদিন সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তাই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে।
প্রকৌশলী দেলোয়ারের অভিযোগ, চূড়ান্ত ইজারা চুক্তির আগেই কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ প্রায় ৩৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, যা আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বৃদ্ধি করে শিল্প ও ভোক্তা পর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত রাজস্ব কাঠামোয় বন্দরের আয় ও অর্থপ্রবাহের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. আবু সাঈদ খান বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে যেকোনো সিদ্ধান্তে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বন্দর রক্ষার প্রশ্নে রাজনৈতিক দল, শ্রমিক, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশের কৌশলগত সম্পদ রক্ষায় একটি সর্বজনীন জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেছেন, কেউ এখন পর্যন্ত প্রমাণ করতে পারেনি যে চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে দিলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে বা জাতীয় নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
‘ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চে দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংহতি জানিয়েছেন, যা প্রমাণ করে বন্দর ইস্যু এখন জাতীয় উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে’, বলছিলেন প্রিন্স।
সরকারের উদ্দেশে প্রিন্স বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কোনো বিদেশি শক্তির তাবেদারি করতে গেলে জনগণ তা মেনে নেবে না। অবিলম্বে এই চুক্তির উদ্যোগ থেকে সরে আসুন।
বাসদ সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেছেন, নিউমুরিং টার্মিনালের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে বড় ধরনের আধুনিকায়নের সুযোগ খুব বেশি নেই। বিদ্যমান যন্ত্রপাতি দিয়েই বহু বছর কার্যক্রম চালানো সম্ভব। বিদেশি অপারেটর এলেই বন্দরের সক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে—এ ধারণাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের ‘স্নায়ুমুখ’ এবং দেশের জিডিপির বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বঙ্গোপসাগর ও চট্টগ্রাম বন্দর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের চুক্তি জাতীয় স্বার্থের আলোকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ট্রেড ইউনিয়ন, চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর আর শুধু চট্টগ্রামের ইস্যু নয়, এটি পুরো বাংলাদেশের মানুষের ইস্যু। দেশের কৌশলগত সম্পদ ধীরে ধীরে করপোরেট পুঁজির দখলে চলে যাচ্ছে। বন্দর রক্ষার আন্দোলনে সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনের মাধ্যমেই জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব।
চট্টগ্রাম সিবিএর সাধারণ সম্পাদক নুরুল্লাহ বাহার বলেছেন, বন্দর ইস্যুতে চট্টগ্রামের মতো ঢাকাতেও আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে এনসিটি গেলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা তসলিম হোসেন সেলিম বলেছেন, আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আন্দোলনের মুখে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটছে। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের হৃদপিণ্ড। এটি বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।
লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত নিরাপত্তারও অংশ। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে জাতীয় সংসদে আলোচনা, জনমত ও পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বাবু, ইফতেখার কামাল খান, বিসিকের সাবেক পরিচালক আবু তাহের খান ভূঁইয়া এবং সিপিবির চট্টগ্রাম জেলা শাখার সদস্য মছিউদ্দৌলা।






