চট্টগ্রাম বন্দর ঘুমায় না

রাতের চট্টগ্রাম বন্দর -আগামীর সময়
চট্টগ্রাম বন্দর। এর সঙ্গে বিশেষণ জুড়ে দেওয়া হয় দেশের প্রধান সামুদ্রিক বন্দর। বিশাল ব্যাপ্তি এর। বঙ্গোপসাগরের উপকূলঘেঁষে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীর মোহনা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই প্রাকৃতিক এক সম্পদের নাম বন্দর। দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইনও। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতির ৯৩ শতাংশ পণ্য আনা-নেওয়া হয় এর মাধ্যমে। বছরে ১৩ কোটি টন।
ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই। আগে বলা হতো বোম্বাই। ভারতের লোকেরা এখনো বলে বোম্বে। এখানকার লোকেরা গর্ব করে বলে, ‘বোম্বে নেভার স্লিপস’ (বোম্বে কখনো ঘুমায় না)। রাতের মুম্বাইয়ের আরেক রূপ। আরব সাগরের তীরে আলো ঝলমলে রাত। মানুষের কোলাহল পাঁচতারকা হোটেলের বারে, ডিস্কোতে। সিনেমা জগতের সুপারস্টার অভিনেতা-অভিনেত্রী অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, সালমান খান, রেখা, কাজল, রানী মুখার্জি— সবার বসবাস এখানে। ছিলেন কিংবদন্তি গায়িকা লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলে। পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন এ দুই বোন। এখন আছেন আরেক কিংবদন্তি শ্রেয়া ঘোষাল। বিনোদনের অন্যতম দুই অনুষঙ্গ সিনেমা-সংগীত হাত ধরাধরি করে চলে এখানে। মুম্বাইয়ের একসময়ের অধিবাসী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট হেড সৌম্য রায় চৌধুরী। তিনি জানাচ্ছেন, চলমান ও গতিশীল, এটি বোঝানোর জন্য ‘দ্য সিটি অব বোম্বে নেভার স্লিপস’ বলা হয়। গভীর রাতেও গাড়ি চলছে, ট্রেন ছুটছে, মানুষ হাঁটছে, রেস্টুরেন্টে খাচ্ছে। এটা মুম্বাইয়ের কালচার, যা খুবই ইউনিক।
সে তুলনায় বাংলাদেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রাম কিছুই না। আবার অনেক কিছু। এ দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিদের অনেকের বসবাস চট্টগ্রামে। টিকে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম, কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, পিএইচপি ফ্যামিলির চেয়ারম্যান সুফি মিজানুর রহমান, আবুল খায়ের গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম চৌধুরী, বিএসআরএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আলীহোসেন আকবরআলী, কেএসআরএম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান, এশিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ সালাম। তারা একেকজন দেশের গর্বের বিলিয়নিয়ার। অর্থনীতির প্রাণপুরুষ। কষ্টে-সৃষ্টে-সৃজনে তারা জীবদ্দশায় নিজেদের মহিমান্বিত করেছেন।
বন্দরের কথা বলতে গিয়ে মানুষের নাম কেন? এসব মানুষ গড়ে তুলেছেন অসংখ্য মাঝারি ও ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সেসব চালাতে পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয় দেশ-বিদেশে। তাও কোটি কোটি টন। হাজার হাজার কোটি টাকার। কনটেইনার পরিবহনে বিশ্বের ১০০ সেরা বন্দরের মধ্যে ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর ছিল ৬৮তম। আর মুম্বাই বন্দরের অবস্থান ২৮তম। ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বন্দরে মোট জেটি ২১টি। এখানে রাতে-দিনে কাজ করেন ১৫ থেকে ২০ হাজার কর্মী। জাহাজে করে বিদেশ থেকে আসা পণ্য নামছে। দেশের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানির জন্য ওঠানো হচ্ছে জাহাজে। বিরতিহীনভাবে চলছে সবকিছু সমানতালে।
চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি থেকে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে বিদেশ থেকে আসা জাহাজ প্রথম নোঙর করে বঙ্গোপসাগরের বহির্নোঙরে। এরও আবার তিন ভাগ, তিন নাম। যেমন— ‘আলফা’, ‘ব্রাভো’ ও ‘চার্লি’। আলফা হলো সাগরের কুতুবদিয়া অঞ্চল। ব্রাভো বাঁশখালী অঞ্চল, আনোয়ারা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সাগরের বন্দরসীমার নাম চার্লি। সাগর পেরিয়ে কর্ণফুলী নদী। এ নদীর তীরেই চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দরে ঢোকার জন্য অপেক্ষায় থাকে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজ। আর কনটেইনারবাহী হলে ১৬০০ থেকে ১৮০০ কনটেইনার। সিরিয়াল ও অনুমতি পেলে ঢোকে ভেতরে। তারপর চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব ক্যাপ্টেন দিয়ে জেটিতে ভেড়ানো হয় সেই জাহাজ। এর প্রধান কারণ হলো, কর্ণফুলী নদী খরস্রোতা ও কিছুটা বাঁকানো। জাহাজ চলাচল নদীর জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল। দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে জাহাজের বিদেশি ক্যাপ্টেনকে নির্দেশনা দিয়ে নিয়ে আসেন স্থানীয় ক্যাপ্টেনরা। চট্টগ্রাম বন্দরের সহকারী হার্ভার মাস্টার ক্যাপ্টেন আসিফ আহমেদ। অনেক বছর ধরে বহির্নোঙর থেকে জাহাজ নদীর জেটিতে ভেড়ানোর কাজ করছেন। যাকে বলা হয় পাইলটিং। তিনি জানালেন, রাত ৩টায় বাসা থেকে বের হয়ে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য সমুদ্রে যেতে হয়। এর জন্য ড্রাইভারকে জেগেও থাকতে হয়। বন্দরে যারা কাজ করেন তাদের অনেকেই এর সঙ্গে যুক্ত। বন্দরের অপারেশন চলতে থাকে সারা রাত।
কি গ্যান্ট্রি ক্রেন হলো সবচেয়ে বড়, দামি ও আধুনিক যন্ত্র, যা দিয়ে বিশাল জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানামা করানো হয়। রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি (আরটিজি) দিয়ে বিশাল সাইজের পণ্যভর্তি ভারী কনটেইনার এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। স্ট্যাডাল ক্যারিয়ার দিয়ে কনটেইনারের সারি থেকে নামিয়ে অন্য সারিতে নিয়ে যাওয়া হয়। ফুল কনটেইনার লোড (এফসিএল) হলো এক আমদানিকারকের পণ্য। লেস কনটেইনার লোড (এলসিএল) হলো একাধিক আমদানিকারকের বিভিন্ন ধরনের পণ্য, যা শেডের ভেতরে শনাক্তকরণ শেষে ডেলিভারি দেওয়া হয়। প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজারের বেশি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরি, প্রাইম মুভারের চলাচল। পণ্য আনছে-নিচ্ছে এসব যান। দিনে যেমন সচল-সক্রিয়, রাতেও তেমনি।
বন্দরে কখনো বিদ্যুৎ যায় না। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সচল থাকে। রাতের আঁধারে বন্দরের শেডে নিয়ন আলোয় আলোকিত। মানুষের চলাচল, কোলাহল থামে না এখানে। রাতে-দিনে আট ঘণ্টা করে তিন শিফট। কাজও চলে খাওয়াও চলে। কেউ শেডের কোনায় কার্টন বিছিয়ে ঘুমায়। কেউ দেয়ালে-কনটেইনারে হেলান দিয়ে ঝিমোয়। চিৎকার-চেঁচামেচি-হৈহুল্লোড়েও এ ঘুম ভাঙে না। এ যে দীর্ঘ ক্লান্তির ঘুম।
বছরে মাত্র ১৬ ঘণ্টা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ থাকে বন্দর। রমজান ও কোরবানিরে ঈদে। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত আট ঘণ্টা করে। ১৩৯ বছরের পুরনো এ বন্দর যখন কাজে ব্যস্ত, তখন পুরো নগরী ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে। জাহাজ থেকে পণ্য নামার বিকট শব্দ অনেক দূর পর্যন্ত কানে বাজে। প্রাইম মুভারে ৪০ ফুটের কনটেইনার টেনে নিয়ে যাচ্ছে গন্তব্যে। বন্দরের সংরক্ষিত এলাকা থেকে বের হওয়ার সময় গেটে পরীক্ষা করা হচ্ছে পণ্যের চালান। ডেলিভারি নিতে কাভার্ড ভ্যান ঢুকছে ভেতরে। তার আগে বৈধ কাগজপত্র চেক করছেন সিকিউরিটি গার্ড। এই যখন বন্দরের ভেতরের অবস্থা, তখন পাশে বন্দর ভবন নীরব-নিস্তব্ধ। কেউ নেই সেখানে। অনুমোদন, অনুমতি, মাশুল পরিশোধের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সারা হয় দিনে অফিস টাইমে। রাতের আঁধারে শুধু বন্দরের ভেতরে কাজের উৎসব চলে নীরব আনন্দে। বন্দর মানেই বিশাল জাহাজ। আমদানি-রপ্তানিকারক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, চালক-হেলপার সবার বিপুল আয়ের হাতছানি। কাজের গতি বাড়ানোর জন্য উৎকোচ বা ‘স্পিড মানির’ দৌরাত্ম্য-রাজত্ব সবই চলে এখানে। অনেক বছর ধরেই বন্দরে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করেছেন মোহাম্মদ জাফর আলম। তিনি বললেন, ‘বন্দর ঘুমায় না, কিন্তু অন্যরা ঘুমায়। কাস্টমস, বন্দর, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এরা সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিস করে। এরপর ডকুমেন্টেশন শেষে বন্দরের শেড থেকে ডেলিভারি শুরু হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বন্দর ব্যবস্থাপনায় জাহাজ থেকে নামার পর তাৎক্ষণিক ডেলিভারি। আদর্শ হতো যদি আমাদের দেশে সব ডিপার্টমেন্ট একসঙ্গে কাজ করত।’
চট্টগ্রাম বন্দরের একটি কমন স্লোগান Country Moves with Us— ‘রাষ্ট্র আমাদের পথ চলার সঙ্গী’। অর্থনীতির একটি সহজ পরিভাষা হলো ২৪/৭। এর অর্থ হলো, সপ্তাহে সাত দিনেই ২৪ ঘণ্টা সচল-সক্রিয়। এ সাংকেতিক পরিভাষার মতো কর্মকর্তারাও বলেছেন— ‘চট্টগ্রাম বন্দর ঘুমায় না।’




