মেয়ে হত্যার প্রমাণ লোপাটে বাসায় ডেকে মাকেও হত্যা!
- ‘খারাপ মেয়ে’ বলায় ফাতেমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা
- বাথরুমের ফলস ছাদে মেয়ে এবং খাটের নীচে ছিল মায়ের লাশ

মা রোকেয়া রহমান ও মেয়ে জোবাইদা রহমান ফাতেমা
ঢাকার কেরানীগঞ্জের কালিন্দীর মুক্তিবাগ এলাকায় স্বামী ও সন্তানকে বসবাস করতেন রোকেয়া রহমান। তাদের পাশেই পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকতেন মীম আক্তার। প্রতিবেশী থেকে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
মিম আক্তার বাসা পরিবর্তন করলেও তাদের মধ্যে যাওয়া-আসা ছিল। মীমের বাসায় পড়তে গিয়েছিলেন রোকেয়ার নবম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেয়ে জোবাইদা রহমান ফাতেমা। তবে সেখানে ফাতেমার সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হয় মীমের বোন নুরজাহান নুসরাতের।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর ফাতেমাকে গলা টিপে হত্যা করেন নুরজাহান৷ এই হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ লোপাটে ফাতেমার মা রোকেয়াকে বাসায় ডেকে নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে তাকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। ঢাকার কেরানীগঞ্জে মা ও মেয়ে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে মামলার বাদী মো. শাহিন আহমেদ আগামীর সময় সময়কে বলেছেন, আমরা সন্তান ও স্ত্রীকে তো আর ফিরে পাব না। এখন আসামিদের ফাঁসি চাই৷ ফাঁসি হলে কিছুটা শান্তি পাব।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেছেন, তদন্তে তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আমরা এতে সন্তুষ্ট। তবে আমরা চাই মামলাটি যাতে দ্রুত সময়ে নিষ্পত্তি করা হয়।
জানা গেছে, গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বিকেল পাঁচটার দিকে ফাতেমা মিমের বাসায় পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় নিখোঁজ হন রোকেয়াও। স্ত্রী ও মেয়ের খোঁজ না পেয়ে প্রথমে কেরানীগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন মো. শাহিন আহমেদ। এরপরও তাঁদের সন্ধান না পেয়ে ৬ জানুয়ারি অপহরণের মামলা করেন তিনি। তদন্ত শেষে গত ৩০ জুন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কেরানীগঞ্জ মডেল থানার উপপরিদর্শক মো. রনী চৌধুরী আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এতে মীম আক্তার ও স্বামী মো. হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইনের সহিত সংঘাতে জড়িত শিশু নুরজাহান ওরফে নুসরাতের বিরুদ্ধে দোষীপত্র দেওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আগামী ২৫ আগস্ট মামলার তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণের দিন ধার্য করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ শেষে মামলাটি বিচারে বদলি করা হবে।
‘খারাপ মেয়ে’ বলায় ফাতেমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা
দুই পরিবারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। রোকেয়াকে জামিনদার রেখে ৫০ হাজার টাকা ঋণও নিয়েছিলেন আসামী মীম আক্তার। তবে কিছু বিষয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্যও ছিল। ঘটনার দিন গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বিকাল ৫টার পরে নুরজাহানের থেকে ভর্তি পরীক্ষার সাজেশন নিতে মীমের বাসায় যান ফাতেমা। সেখানে তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, তখন নুরজাহানকে ‘খারাপ মেয়ে বলে গালি’ দিয়ে গায়ে হাত তোলেন ফাতেমা। এর জেরে নুরজাহান ফাতেমাকে গলা টিপে করে হত্যা করেন।
মেয়ে হত্যার প্রমাণ লোপাটে মাকে হত্যার পরিকল্পনা
আসামি মীম আক্তার রুমে ঢুকে ফাতেমার মরদেহ দেখেন। তখন তারা প্রমাণ লোপাটের পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ফাতেমার পরিহিত পোশাক খুলে নুরজাহান সেই পোশাক পরেন। ব্যাগের ভেতর বোরকা নিয়ে বাসা থেকে বের হন। বাইরে গিয়ে নুরজাহান ওই বোরকা পরেন এবং ব্যাগটি ফেলে দিয়ে বাসায় ফেরত আসেন। এরপর প্রমাণ লোপাটে ফাতেমার মা রোকেয়া রহমানকেও হত্যার পরিকল্পনা করেন তারা।
বাথরুমের ফলস ছাদে মেয়ে এবং খাটের নীচে ছিল মায়ের লাশ
গত ২৫ ডিসেম্বর আসামি নুরজাহান ফাতেমার মাকে হোয়াটসঅ্যাপে দুইবার কল দিয়ে বাসায় আসতে বলেন। ফোন পেয়ে রোকেয়া আসামি মীম আক্তারের বাসার নিচে আসেন। তখন মীম আক্তার তাকে বাসায় নিয়ে আসেন। মীম তার স্বামী হুমায়ুন কবিরকেও বাসায় আসার জন্য ফোন করেন। রোকেয়া বাসায় ঢুকে তার মেয়ে ফাতেমার বিষয়ে জানতে চান। তখন মীম আক্তার ও তার বোন নূরজাহান জানায়, ফাতেমা পড়া শেষ করে কিছুক্ষণ আগেই চলে গেছে। তখন রোকেয়া জানান, তার মেয়ে বাসায় যায়নি। এই নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়।
আসামি মীম ও নূরজাহান ঝগড়া করে সময় ক্ষেপণ করেন। কিছুক্ষণ পর হুমায়ুন কবির বাসায় আসেন। তিনি রোকেয়াকে ধাক্কা দিয়ে বাসার মেঝেতে ফেলে দেন। আসামী মীম ভুক্তভোগী রোকেয়ার গলা চেপে ধরেন। নুরজাহান তার ওড়না দিয়ে রোকেয়ার গলা পেঁচিয়ে পিছন থেকে টান দিলে তিনি মারা যান। পরে তিনজন মিলে রোকেয়ার মরদেহ খাটের নিচে এবং ফাতেমার মরদেহ বাথরুমের ফলস ছাদে লুকিয়ে রাখেন।
কয়েকদিন পর রুমের ভেতর থেকে গন্ধ বের হলে প্রতিবেশীরা পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে হত্যার ২১ দিন পর ১৫ জানুয়ারি তাদের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে মীম আক্তার ও নুরজাহানকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরদিন ১৬ জানুয়ারি মীম আক্তার ও নুরজাহানকে আদালতে পাঠানো হয়। তারা দুজন বিচারকের কাছে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। ওইদিন তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকে তারা কারাগারে পাঠানো রয়েছেন। গত ১৭ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কেরানীগঞ্জের মুক্তিরবাগ এলাকা থেকে মিমের স্বামী হুমায়ুন কবিরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ২০ জানুয়ারি আদালত তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে তিনি কারাগারে আটক রয়েছেন।



