মোবাইল মেকানিক রনি হত্যা
অপমানিত বোধ থেকে খুন ফোন নাম্বারে খুলল জট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর ইস্টার্ন মল্লিকা মার্কেটে মোবাইল সার্ভিসিং করতেন আবুল হাসান রনি। বছর পাঁচেক আগে তাকে রক্তাক্ত ও অজ্ঞান অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করেছিল অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর দুদিন পর শাহবাগ থানায় অপমৃত্যুর মামলা দেন তার বাবা। কিন্তু ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে হত্যা প্রমাণ হলে ঘুরে যায় ঘটনার মোড়, রূপান্তর হয় মামলাটিও। তবে পাওয়া যাচ্ছিল না ঘাতক। তদন্তের একপর্যায়ে মেলে হাসপাতালে ভর্তির নথিতে দেওয়া একটি ফোন নাম্বার। সেই সূত্র ধরে উন্মোচন হয় খুনের রহস্য।
সংশ্লিষ্ট নম্বরের সিমটি রেজিস্ট্রেশন করা পটুয়াখালীর জামাল হোসেনের নামে। বায়োমেট্রিক তথ্য অনুযায়ী তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসে অন্য কাহিনি। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, নাম্বারটি ব্যবহার করতেন তার ছোট ভাই তারিকুল ইসলাম তারেক। এক লাফে তদন্ত কার্যক্রম ফিরে এলো রাজধানীতে। কারণ, সিমধারী যুবক পড়তেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি)।
পুলিশ জানাল, খোঁজ করার আগেই নিরুদ্দেশ তারেক। তার ভাইকে আটকের খবর শুনেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, পরের হাতকড়াটি অপেক্ষা করছিল তার জন্যই। এই ঢাবি শিক্ষার্থীর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করল পুলিশ।
কিন্তু পাওয়া গেল না তারেককে। তাকে ধরার জন্য জাল ফেলল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। টাকি ধরার জাল হলেও উঠল মাগুর মাছ! তারেকের আগেই আটক হন তার বন্ধু শেখ মারুফ হোসেন সুজন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর আবার গোড়ায় ফিরে এলো পুলিশ। আরেকবার মোড় নিল ঘটনা।
সুজনের ভাষ্য, ২০২১ সালের ১ জুন রাতে বসে ছিলেন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। তার কাছে গাঁজা আছে কি না জানতে চান অপরিচিত এক ব্যক্তি (রনি)। এতে অপমান বোধ করে ক্ষেপে যান। শুরু হয় বাগ্বিতণ্ডা। একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি। এরই মধ্যে সেখানে উপস্থিত হন সুজনের বন্ধু ঢাবি শিক্ষার্থী তারেক ও রাজিব হোসেন। তাদের সঙ্গে পেরে ওঠেননি রনি, ধাক্কা খেয়ে পড়ে আঘাত পান মাথায়। মুহূর্তেই হারিয়ে ফেলেন জ্ঞান, ঝরছিল রক্ত। তিন শিক্ষার্থী মিলে তাকে ভর্তি করেন ঢামেক হাসপাতালে। ভর্তির সময় রেজিস্ট্রি খাতায় দেওয়া হয়েছিল তারেকের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের নম্বর, যেটি আসলে নিবন্ধন করা ছিল তার ভাই জামালের নামে।
অন্য দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের বর্ণনা দিলেন তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই মো. আলামিন। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, সুজনের দেওয়া তথ্যে গ্রেপ্তার করা হয় তারেক ও রাজিবকে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছেন, উদ্যানে উপস্থিত হওয়ার আগেই রক্তাক্ত হয়েছিলেন রনি। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সহায়তা চেয়েছিলেন সুজন। এই সহায়তাই হয়েছে কাল!
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাবির ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেন সুজন। কিন্তু তার বেপরোয়া আচরণের জন্য তাকে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চলাফেরা করতেন বহিরাগতদের সঙ্গেও। জড়িয়ে পড়েন মাদকে। মাঝেমধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সিনিয়র-জুনিয়র ও বহিরাগতদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়াতেন তিনি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগও জানিয়েছেন কয়েক ব্যক্তি।
এ মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়ার তথ্য জানালেন এসআই আলামিন। তার বর্ণনা, ঢাবির তিন শিক্ষার্থীকেই আসামি ধরে শেষ করা হয় তদন্ত। তারা বাঁচার জন্য একে অন্যকে দোষারোপ করছেন, তবে মূল অভিযুক্ত সুজন। তার ধাক্কাতেই আঘাত পেয়েছিলেন রনি, যার কারণে অবশেষে হয় মৃত্যুও। তাকে প্রধান আসামিসহ তিনজনকে অভিযুক্ত করে গত ৩১ মে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে আদালতে। এখন বাকি সিদ্ধান্ত জানাবেন আদালত।
মামলার বাদী আবদুল মতিনের ব্যবহৃত ফোন নম্বরে কল দিলে রিসিভ করেন তার মেয়ে তথা নিহতের বোন মুন্নী ইয়াসমিন। তিনি জানালেন, মাস পাঁচেক আগে মারা গেছেন তার বাবা। আদালতে পুলিশ চার্জশিট দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে তাদের। এর বেশিকিছু বলতে পারলেন না তিনি।




