সরকারি আবাসনে অভিযান
ভাড়াটিয়া বিপাকে, বাসিন্দারা খুশি

সংগৃহীত ছবি
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৭ অক্টোবর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ওইদিন ঢাকার জনসেবা, পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতি দেখতে বেশ কিছু জায়গা পরিদর্শন করেছিলেন। তারই একটি রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টার্স। সেখানে গিয়ে তিনি পুরো এলাকার অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এ ছাড়া কোয়ার্টার্সের সাধারণ বাসিন্দারাও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবাসনের ভেতরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে সরাসরি অভিযোগ জানিয়েছিলেন। বাসিন্দাদের এই অভিযোগের বিষয়ে দায়িত্বরতদের কাছে প্রধানমন্ত্রী জবাব চাইলে উপস্থিত গণপূর্তের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন— ভেতরে অনেক সাবলেট থাকার কারণে আবাসিক এলাকাটির পরিবেশ নোংরা থাকে। তখন তাৎক্ষণিকভাবে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। আর এতেই নড়েচড়ে বসে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
গত বৃহস্পতিবার তারা ৩১ অক্টোবরের মধ্যে সরকারি কোয়ার্টার্সে থাকা সব ভাড়াটিয়াকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। গত শনিবার নির্ধারিত সময় শেষ হলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি আবাসন পরিদপ্তর থেকে গতকাল রবিবার তল্লাশি চালানো হয় মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলে এই অভিযান। এ সময় অন্তত ২৬টি বাসায় অভিযান চালানো হয়। অভিযানে দুই বাসা পুরোপুরি ভাড়া দেওয়া পাওয়া গেছে, কয়েকটিতে মিলেছে সাবলেট ভাড়াটিয়া। তবে কোয়ার্টার্স ছাড়ার নোটিস পেয়ে শুক্রবারই কয়েকটি বাসার ভাড়াটিয়া চলে গেছেন বলেও অভিযানে উঠে এসেছে।
জানা গেছে, অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের নামে বরাদ্দ হওয়া ফ্ল্যাট বা রুম অবৈধভাবে বাইরের মানুষের কাছে সাবলেট দিতেন। ৯ হাজার থেকে ১১ হাজার টাকায় কলোনির প্রতিটি রুম সাবলেট দেওয়া হতো।
এখানেই শেষ নয়, সরকারি আবাসিক এলাকায় বাসায় সাবলেট বা ভাড়া দেওয়ার পরও অনেকে আবাসনের ভেতর খালি জায়গায় ভবন তুলে ভাড়া দিয়েছেন। সেখানে গড়ে উঠেছে মাদ্রাসা এবং কোচিংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে অনন্যা কিন্ডারগার্টেন, জুস কর্নার, ব্রাইট কোচিং সেন্টারের নাম উল্লেখযোগ্য। এর বাইরে কলোনির কিছু বাসিন্দা মিলে ‘আইডিয়াল জোন সমাজকল্যাণ’ সমিতি নামে একটি অফিসও তৈরি করেছেন। সেটির ভেতরেও চলে কোচিং সেন্টারের কার্যক্রম। এমন অসংখ্য অবৈধ প্রতিষ্ঠান রয়েছে কলোনির ভেতর। কলোনির ভেতরের খালি জায়গায় অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে এসব প্রতিষ্ঠান ভাড়া দেওয়ার সঙ্গে জড়িত কলোনির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী।
হঠাৎ করে অভিযানের ফলে বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থীসহ চাকরিজীবী সাবলেট থাকা শত শত মানুষ। অনেকেই সাবলেট থাকেন, সেটি স্বীকার না করলেও এমন আকস্মিক অভিযানে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আবার কেউ কেউ ক্ষোভ জানিয়েছেন সরাসরি। অন্যত্র চলে যাচ্ছেন এমন কয়েকজন ভাড়াটিয়া অভিযানের সময় অভিযোগ করে বলেছেন, ভাড়াটিয়ার তো কোনো দোষ নেই। তারা তো দেয়ালে সাবলেট দেখেই ভাড়া নিয়েছেন। এখন হঠাৎ করে তারা কোথায় যাবে? তবে এজিবি কলোনিতে বাসা বরাদ্দ পাওয়া বেশ কয়েকজন অভিযান নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। নীলিমা নামে এক নারী কলোনির দেয়াল দেখিয়ে বললেন, নানা কোচিং, সাবলেট এবং বিজ্ঞাপন সাঁটানোর কারণে ভবনের দেয়ালের রঙ খসে পড়েছে। নষ্ট হয়েছে কলোনির নান্দনিক পরিবেশ।
সরকারি বাসভবনে অবৈধ সাবলেট বন্ধের বিশেষ অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. বুলবুল হাসান জানিয়েছেন, ভাড়াটিয়া পেলেই সরাসরি বাসা বরাদ্দ বাতিল করা হচ্ছে। পাশাপাশি থাকছে কঠোর বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। তবে অভিযানের শুরুতেই অনেকে সাবলেট থাকার কথা অস্বীকার করেন। পরে অভিযানের প্রতিনিধিদল ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে ভাড়াটিয়াদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে একে একে প্রকাশ পায় সাবলেট বা ভাড়া দেওয়ার তথ্য।
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আকতার মাহমুদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘রাজধানীতে এমনিতেই সরকারি আবাসনের সংকট রয়েছে। অনেকের খুব ক্রাইসিস (সংকট) থাকার পরও তারা সরকারি আবাসনে বাসা বরাদ্দ পায় না, বিশেষ করে কম বেতনের কর্মচারীরা। অথচ যারা এখানে বরাদ্দ পেয়েও তা ভাড়া দেয় তাদের আসলে প্রয়োজন নেই বাসার।’
‘ফলে সরকারের উচিত যাদের সত্যিই বাসার প্রয়োজন আছে, তাদের চিহ্নিত করে বাসা বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া’— যোগ করলেন তিনি।




