ডিএসসিসির ড্রেন পরিষ্কার
ঝুঁকি অনেক বেশি নেই নিরাপত্তা সরঞ্জাম
- ডিএসসিসির প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে ড্রেনের ঠিকাদার
- নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে ৫টি যন্ত্র দেয় ডিএসসিসি
- পুরো শরীর ঢাকা পানিরোধী বুট ও স্যুট দেওয়া হয় না

তার নাম মিলন। পেশায় ডুবুরি। রাজধানীর ড্রেনের যেকোনো সমস্যা সমাধানে তিনি সিদ্ধহস্ত। আর সেই ড্রেন পরিষ্কারে নেমেই সম্প্রতি প্রাণ গেছে তার। কারণ, যখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ড্রেন পরিষ্কারে নেমেছিলেন তিনি, তখন সঙ্গে ছিল না কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম। গত ১৬ জুলাই ঘটে এ ঘটনা। সেদিন সকালে মিলনসহ কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ডিএসসিসির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন লালবাগের নলগোলা এলাকার একটি গভীর ও রুদ্ধ ড্রেন পরিষ্কারে নামেন। পানির নিচে কাজ করার জন্য একটি পাইপের মাধ্যমে ওপর থেকে অক্সিজেনের লাইন দেওয়া হয়েছিল। একপর্যায়ে পানির ভেতরেই অক্সিজেনের লাইনটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে নিমিষেই পানির তোড়ে এবং বিষাক্ত গ্যাসে ড্রেনের ভেতরে নিখোঁজ হয়ে যান মিলন। প্রথমে সহকর্মীরা চেষ্টা চালিয়ে কোনো খোঁজ পাননি তার। পরে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২৫ ঘণ্টারও বেশি সময় পর ১৭ জুলাই দুপুর আড়াইটার দিকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৪০০ মিটার দূরের একটি ড্রেন থেকে মিলনের নিথর দেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস।
ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ড্রেন পরিষ্কারের জন্য ঠিকাদার জাকির আহমেদ বাবুর প্রতিষ্ঠান থেকে ড্রেনে নেমেছিলেন মিলন। বাবু ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। পাশাপাশি বৃহত্তর লালবাগ থানা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতিও।
অভিযোগ উঠেছে, শুধু অক্সিজেন পাইপ নিয়েই সেদিন ড্রেনে নেমেছিলেন মিলন। তার মতো রাজধানীর অন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরও হালকা নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিয়ে আবার কখনো কখনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই ম্যানহোল বা ড্রেনে নেমে কাজ করতে হয়। এতে হরহামেশাই ঘটছে ভয়ংকর সব দুর্ঘটনা। মারা যাচ্ছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। যদিও এসব দুর্ঘটনায় কতজন মারা যান, তার সঠিক তথ্য নেই কারও কাছে। বেশিরভাগ সময়ই মৃত্যুর পর অর্থের বিনিময়ে পরিবারকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ সচেতনও হয় না, পরে কোনো ব্যবস্থাও নেয় না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানালেন, বেশিরভাগ সময়ই কোনো সেফটি গিয়ার ব্যবহার না করেই ড্রেনে নামানো হয় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের। এসব কর্মী যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করেন, তারাও কোনো সেফটি গিয়ারের ব্যবস্থা করে না।
মিলনের মৃত্যুর পর ড্রেন পরিষ্কারে নামা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিরাপত্তা এবং অব্যবস্থাপনা নিয়ে ফের প্রশ্ন ওঠে। নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘ম্যানহোলের বা বদ্ধ পাইপের ভেতর বিষাক্ত মিথেন বা অন্য গ্যাস থাকে। এটি জানা সত্ত্বেও সেখানে নামার ক্ষেত্রে যে পরিমাণ প্রিকশন লাগে, সেগুলো না নিয়ে নর্দমা পরিষ্কার করতে কোনো কর্মীকেই নামার জন্য কিন্তু রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অনুমতি দেওয়ার কথা নয়। যদি সরকারি সংস্থা সরাসরি না-ও নামায়, কিন্তু কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ করায় তাহলেও তার চুক্তিপত্রে এসব বিষয় থাকতে হবে। শুধু থাকলেই হবে না বরং ঠিকাদার সেগুলো মানছে কি না, তাও নিশ্চিত করতে হবে।’
জানা গেল, ডিএসসিসি সারা বছরের জন্য প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে নর্দমা পরিষ্কারের ঠিকাদার নিয়োগ করে। যাদের মাধ্যমে তারা ড্রেন পরিষ্কারের কাজ করায়। এর বাইরে দক্ষিণ সিটি প্রয়োজন এবং চাহিদার ভিত্তিতে নিজেদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দিয়েও কখনো কখনো ড্রেন পরিষ্কারের কাজ করায়। ড্রেনে কাজ করা এই কর্মীর সংখ্যা ২৫০ থেকে ৩০০ জনের মতো। দক্ষিণ সিটিতে বর্তমানে ৫ হাজারের কাছাকাছি পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে যারা ড্রেনে কাজ করেন তাদের সংস্থাটি কাঁটা (পাঁচ আঙুল সদৃশ একটি বর্জ্য টেনে আনার যন্ত্র), ঝাড়ু, ময়লা নেওয়ার টুকরি, হাতগাড়ি এবং বেলচা; মোট পাঁচটি যন্ত্র সরবরাহ করে। এর বাইরে কখনো কখনো তাদেরকে হাতের জন্য গ্লাভসও (সুরক্ষা মোজা) দিয়ে থাকে। এসব টুকটাক সরঞ্জাম ছাড়া আর কোনো ভারী সুরক্ষা যন্ত্রপাতি দেয় না ডিএসসিসি।
এ বিষয়ে প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক এয়ার কমডোর মো. মাহবুবুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ‘নিজেদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দিয়ে আমরা প্রয়োজনের ভিত্তিতে ড্রেনের কাজ করাই। বেশিরভাগই করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদেরই নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়ার কথা কর্মীদের। আমাদের চুক্তিপত্রে তেমনটাই উল্লেখ আছে।’ তবে কেউ ড্রেনের কর্মীদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম না দিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেন এই কর্মকর্তা।
খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ম্যানহোল বা ড্রেনে কাজ করা একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সুরক্ষার জন্য কিছু জিনিস অতি প্রয়োজনীয়। যার মধ্যে সম্পূর্ণ বডি ও পা সিল করা ওয়াটারপ্রুফ বুট এবং ড্রেস (রেইনকোট বা ট্র্যাকস্যুটের মতো), দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত গ্যাস থেকে রক্ষায় হেলমেটের সঙ্গে সংযুক্ত অক্সিজেন মাস্ক/বেল্ট, গ্লাভস অন্যতম। প্রফেশনাল স্কুবা গিয়ার, স্থায়ী অক্সিজেন ট্যাংক বা আধুনিক সেফটি ইক্যুইপমেন্ট ছাড়া এই কাজ করা যে কারও জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।





