মোহাম্মদপুরের অপরাধে লাগাম টানবে কে
- তালিকায় ১৬ গ্যাং স্থানীয়দের মতে অর্ধশত
- সন্ধ্যা নামলেই গ্যাংয়ের মহড়া
- আতঙ্কে মোহাম্মদপুর ছাড়ছে মানুষ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বলা হলেও অপরাধের রাজধানী বলা হয় মোহাম্মদপুরকে। প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন, গুলি করে হত্যা, শরীর থেকে হাত-পা বিচ্ছিন্ন, সন্ধ্যা নামলেই দেশীয় অস্ত্রের মহড়াসহ কী না হয় সেখানে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরও হামলা চালায় এখানকার অপরাধীরা।
অপরাধের স্বর্গরাজ্য হয়ে ওঠার বিষয়ে মোহাম্মদপুরবাসী দায়ী করছেন পুলিশের দুর্বলতাকে। তবে পুলিশের যুক্তি, ঘনবসতি এলাকায় অপরাধ দমন করতে বেগ পোহাতে হয়, আক্রমণের শিকারও হচ্ছেন তারা। প্রতিদিন অভিযান, গ্রেপ্তার করেও কমছে না অপরাধ। পুলিশের দাবি, আবার আশপাশের থানাগুলোর ঘটনাও মোহাম্মদপুর থানা এলাকার ঘটনা বলেও চালিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হলেও দেশের বিদ্যমান আইনে খুব সহজেই জামিন পাচ্ছে ও ফের একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক প্রভাবকে পাশে রেখে অপরাধীকে শুধু অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করে গ্রেপ্তার করতে হবে।
২৩ জুলাই মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিংয়ে পুলিশের এক এসআইকে ছুরি মেরে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ছুরির আঘাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে কর্মরত পুলিশ সদস্য ওসমান গনির পিঠে ৪৩টি সেলাই দেওয়া হয়। এর আগে রায়েরবাজার ইটখোলা এলাকায় বাসা থেকে ডেকে নিয়ে আসাদুল নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। শুধু পুলিশ বা সাধারণ মানুষই নয়, কিশোর গ্যাং গ্রুপের সঙ্গে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সংঘর্ষও ঘটে প্রতিনিয়ত।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গিয়ে উল্টো বিপদে পড়ছেন বাসিন্দারা। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে, পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করলেও কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে এসে তারা অভিযোগকারীর ওপর হামলা চালাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, মোহাম্মদপুরে ছোট থেকে বড় সবাই গ্যাংয়ের সদস্য। কিশোর, তরুণ ও যুবকরা বুঝে ওঠার আগেই মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ে। দেশীয় অস্ত্র সহজেই তাদের হাতে চলে আসে। ফলে মোহাম্মদপুর ‘ক্রাইম হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে। অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হওয়ায় অনেকে মোহাম্মদপুর ছেড়ে চলেও যাচ্ছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদনে, মোহাম্মদপুর থানাকেন্দ্রিক মাত্র ১৬টি সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য রয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, বাস্তবে এর সংখ্যা অর্ধশত। এর বাইরেও মোহাম্মদপুরের মধ্যাংশের প্রতিটি গলিতেই আছে শিশু-কিশোরদের একাধিক গ্যাং।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান ছাড়াও তিন রাস্তার মোড় থেকে রায়েরবাজার, বসিলা ৪০ ফুট, পুলপাড় বটতলা, বসিলা গার্ডেন সিটি, একতা হাউজিং, নবোদয় হাউজিং, বোটঘাট, সাদেক খান রোড, স্লুুইসগেট এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বেশি। বিশেষ করে পাটালি গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, লারা দে গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, আর্মি আলমগীর গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, নবী গ্রুপ, ডায়মন্ড ও দে ধাক্কা গ্রুপগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আতঙ্কের নাম হয়ে আছে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্য আগামীর সময়কে জানায়, মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার, চন্দ্রিমা, বসিলা, মডেল টাউন, ঢাকা উদ্যানে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে। ছোট বা বড় যেকোনো ইস্যুতেই এই এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের মহড়া হয়। এসব গ্যাংয়ের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা।
মোহাম্মদপুরের অপরাধ দমনে পুলিশের জনবল সংকটকে বড় কারণ হিসেবে দেখছে পুলিশ। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার (মোহাম্মদপুর জোন) জুয়েল রানা আগামীর সময়কে বললেন, ‘এখানে যেমন ঘনবসতি, কম আয়ের মানুষের বসবাস— সেরকম একটা শহরে কমসংখ্যক পুলিশ দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং দমন করা কষ্টসাধ্য। তবে পুলিশের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই।’
মোহাম্মদপুর অপরাধপ্রবণ হওয়ার পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা ও অদক্ষতাকে দায়ী করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তার মতে, ‘এই এলাকাটি অপরাধপ্রবণ হওয়ার পেছনে তিনটি উপাদান রয়েছে। প্রথমত, এখানে বিহারিদের বসবাস এবং তাদের দিয়ে বিভিন্ন অপরাধ করানো। দ্বিতীয়ত, মোহাম্মদপুর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল, যেখানে তুলনামূলক কম খরচে জীবনযাপন সম্ভব। এ সুযোগে অপরাধীরা এখানে বেশি বসবাস এবং অপরাধ সংঘটিত করে। তৃতীয়ত, অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা নিজেরাই তাদের আশ্রয়দাতা হয়ে ওঠে।’
মোহাম্মদপুরকে বলা হয় অপরাধের রাজধানী। এখানে তালিকাভুক্ত ১৬টি কিশোর গ্যাং থাকলেও স্থানীয়দের মতে, অর্ধশত কিশোর গ্যাং বিরাজ করছে। অথচ তাদের বেশিরভাগের ব্যাপারেই তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। জনবল সংকট ও নানা প্রতিবন্ধকতায় অপরাধ দমনে অসহায় পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, অপরাধ ঘটলে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
সম্প্রতি র্যাব এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে শুধু র্যাবের হাতেই প্রায় দেড় হাজার অপরাধী ধরা পড়েছে। তাদের অনেকে পরবর্তী সময়ে ‘আইনের মারপ্যাঁচে’জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার অপরাধে জড়াচ্ছে। তার ভাষ্য, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মোহাম্মদপুর অঞ্চলের মাদক, ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। আইনি মারপ্যাঁচে তারা ফিরে এসে আবার অপরাধ করছে।
মোহাম্মদপুরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবার বসিলায় একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ ক্যাম্প থেকে ২৪ ঘণ্টা টহল, ব্লক রেইড ও চেকপোস্ট পরিচালনার মাধ্যমে অপরাধ দমনের আশা করছে পুলিশ। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের সেকেন্ড ইন কমান্ড মো. ফজলুল করিম বললেন, ‘বসিলায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনে ৪০ জন সদস্য এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের ৬৬ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এখানে আলাদা জনবল ও গাড়ি বরাদ্দ রয়েছে। আমরা আশা করছি, এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব।’




