সবজি কিনতেই শেষ বেতনের অর্ধেক

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও বন্যায় বিপর্যস্ত দেশের পূর্ব, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। সেই তুলনায় রাজধানীতে তেমন কোনো সংকট না থাকলেও চড়া শাকসবজিসহ সব কাঁচাপণ্যের বাজার। ১০০ টাকার নিচে ভালো মানের সবজি মেলাই ভার। এই অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যের কারণ জানতে চাইতেই বৃষ্টি-বন্যাকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে ক্রেতাদের প্রশ্ন আড়তদারদের নৈতিকতা নিয়ে— বর্ষার প্রভাব সীমান্ত এলাকায় হলেও বাজারে কেন দাম বাড়বে? ওই এলাকা থেকে তো আর শাকসবজি আসে না।
ভোক্তাদের এমন সরল প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি নয় কেউ। তবে আছে নিত্যনতুন অজুহাত। সবজি বিক্রেতারা বলছেন, টানা বৃষ্টি ও বন্যায় কৃষকের ক্ষেতের সবজি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কমে গেছে সরবরাহ। কাঁঠালবাগানের স্বপনের মোড়ে সবজি বিক্রেতা রিয়াজুল হকের ভাষ্য, ‘আমরাও বেশি দামে কিনে আনছি। মানুষও জানে বৃষ্টির সময় দাম বাড়ে। সবচেয়ে বেশি দাম এখন গোল বেগুনের।’
তবে ব্যবসায়ীদের এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগকে অনেক সময় অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে বাজারে আদায় করা হয় অতিরিক্ত দাম। কারওয়ান বাজারের সুফিয়া বেগমের আক্ষেপ, বৃষ্টি হলেই সবজির বাজারে লাগে আগুন; কিন্তু আমাদের বেতন তো বাড়ে না। সবজি কিনতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে মাসের অর্ধেক টাকা।
শাকসবজির দাম চড়া হওয়ায় কাটছাঁট হচ্ছে বাজারের তালিকা, টান পড়েছে মানুষের খাবারের পাতে। আগে সবজিসহ একাধিক তরকারি খাওয়ার সুযোগ হলেও এখন অধিকাংশ মধ্যবিত্ত এবং সব নিম্নমধ্যবিত্তের থালে একাধিক তরকারি মেলা যেন সৌভাগ্য। আর নিম্নবিত্তের কাছে তরকারি পাওয়াই আনন্দের।
কাঁঠালবাগানের একটি ছোট হোটেলে দুপুরের খাবার খেতে এসে রহমান নামের নিয়মিত ক্রেতার অভিযোগ, আগে ভর্তা আর তরকারি বেশি দিতেন, এখন এত কম কেন? হোটেলের কর্মচারী শফিকের জবাব, ‘ইচ্ছা করে কম দিচ্ছি না ভাই, সবজির দাম এত বেড়েছে যে আগের মতো দিলে দোকান চালানোই অসম্ভব।’
একটি ছোট হোটেলের এ দৃশ্যই এখন রাজধানীর সামগ্রিক বাস্তবতা। টানা এক মাসের বৃষ্টিপাত, দেশের বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যা এবং সরবরাহব্যবস্থার অজুহাতে ঢাকার বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম। এর প্রভাব শুধু নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নাঘরেই নয়, পড়েছে হাজারো ক্ষুদ্র হোটেল, ভাতের দোকান ও রেস্তোরাঁর ওপরও। একদিকে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় কম সবজি কিনছেন, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা একই দামে খাবার বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই খাচ্ছেন হিমশিম।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাঁঠালবাগান, হাতিরপুল ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, গোলবেগুন প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৪০ এবং লম্বাবেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়। করলা, বরবটি ও কাঁকরোলের কেজি ১০০-১২০ টাকা। কচুরলতি ৯০-১০০, ধুন্দুল, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, পটোল ও ঢেঁড়স ৬০-৮০ টাকা। প্রতি পিস লাউ কিনতে গুনতে হচ্ছে ৭০-৯০ টাকা। বর্ষার বাজারে কিছুটা কমে মিলছে শুধু পেঁপে, যার কেজি ৩০-৪০ টাকা। অথচ মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও এসব সবজির অনেকটি ২০-৩০ টাকা কম দামে পাওয়া যেত। হাতিরপুলের বাজারে গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮৫০ এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকায় স্থির। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮০ ও কক মুরগি ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজির মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ছোট হোটেলগুলোয়। কাঁঠালবাগানের পেপার গলির শাহজালাল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের কর্মী শফিকের ব্যাখ্যা, আগে প্রতিটি প্লেটে যে পরিমাণ তরকারি দেওয়া হতো, এখন তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ গোলবেগুন কিনতেই চলে যায় অনেক টাকা। ভর্তা বানালে আগের মতো পরিমাণ হয় না; কিন্তু কাস্টমার তো বুঝতে চান না। কম দিলে আবার বলেন, ‘আরেকটু দেন।’ একই দামে ব্যবসা চালিয়ে লাভ করা তো দূরের কথা, দোকান টিকিয়ে রাখাই কঠিন।



