৩ বছরে সৌদিতে ৩৬৩ বিদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, বাংলাদেশি কত?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড হয় কোন দেশগুলোতে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সৌদি আরবের নাম সামনের সারিতেই উঠে আসে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তা নিয়ে আলোচনার মধ্যে পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, গত তিন বছরে বিভিন্ন অভিযোগে ৮৬৪ ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব।
ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজশেন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর) তথ্য আরও দেখাচ্ছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে চীন। এরপর রয়েছে ইরান। তার পরের অবস্থানটিই সৌদি আরবের।
ইএসওএইচআরের তথ্য অনুসারে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৫৮৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে সৌদি আরবে।
অ্যামনেস্টি ২০২৩ সালে সৌদি আরবে বিভিন্ন অপরাধে ১৭২ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য দিচ্ছে। পরের বছর সংখ্যাটি দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪৫ জনে। হিসাব করলে দেখা যায়, ওই বছর প্রতি ২৫ ঘণ্টায় একজনের শিরশ্ছেদ হয়েছিল দেশটিতে।
একক বছর হিসেবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ২০২৫ সালে। ওই বছর সৌদি আরব মোট ৩৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।
২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন বছরে সৌদিতে যে ৮৬৪ ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তার মধ্যে ৩৬৩ জন অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশই বিদেশি নাগরিক। এই বিদেশিদের মধ্যে অন্তত ১১ জন ছিলেন বাংলাদেশি।
ইএসওএইচআরের তথ্য জানাচ্ছে, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বিদেশি নাগরিকদের বেশিরভাগই এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশের নাগরিক।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হলো— সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, মিশর, আফগানিস্তান, জর্ডান, নাইজেরিয়া, সিরিয়া, ইরান, সুদান, ভারত ও বাংলাদেশ।
২০২৩ সালে আটজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে ইএসওএইচআরের বার্ষিক প্রতিবেদনে। সে বছর মোট ৩৮ বিদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় সৌদিতে।
২০২৪ সালে একজন বাংলাদেশিসহ মোট ১৩৮ বিদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি আরব। এই বিদেশিদের মধ্যে বড় অংশের শাস্তি হয় মাদকসম্পর্কিত অপরাধ এবং খুনের জন্য।
২০২৫ সালে সর্বাধিক মৃত্যুদণ্ডের বছরে ১৮৮ বিদেশির দণ্ড কার্যকর হয়, যা ছিল মোট সংখ্যার ৫২ শতাংশ। তবে তার মধ্যে কোনো বাংলাদেশি ছিল কি না, সেই তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০২৫ সালে বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বড় অংশটিই ঘটেছিল মাদক চোরাচালান বা মাদকের অপরাধের দায়ে। এ অপরাধে মোট ২৪০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটি যে ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশি রয়েছেন বলে ইএসওএইচআরের তথ্য জানাচ্ছে। তবে কতজন, তার উল্লেখ নেই তাদের প্রতিবেদনে। এ বছরের জুনের পর যোগ হয়েছেন দুই বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার।
এ বছরের প্রথম ছয় মাসে যে ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাদের মধ্যে ৪৯ জন সৌদি আরবের নাগরিক। বাকি ৫৯ জন তথা ৫৪ শতাংশই বিদেশি। অর্থাৎ, চলতি বছর দেশটিতে বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি।
এর মধ্যে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগে ৭১ জনের, হত্যার অভিযোগে ২৫ জনের, নিরাপত্তাজনিত কারণে ৯ জনের এবং অন্যান্য কারণে আরও তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
এ বছর প্রথম ছয় মাসে দণ্ডপ্রাপ্ত ৫৯ বিদেশি নাগরিকের মধ্যে বাংলাদেশসহ আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইথিওপিয়া, সুদান, ইয়ামেন, সিরিয়া, জর্ডান, সোমালিয়া, মিশর, নাইজেরিয়া, বেনিন, ইরাক, কুয়েত, কেনিয়া ও উগান্ডার নাগরিক রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তবে, কোন দেশের কতজন নাগরিক এই দণ্ড পেয়েছেন তা উল্লেখ করা হয়নি।
এরপর গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানায় সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও অপরাধের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এদিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে বিষয়টি জানায়নি বলে জানিয়েছে জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট। এ ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ও বিস্তারিত তথ্য চেয়ে কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হয়েছে।
যেসব কারণে মৃত্যুদণ্ড?
সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক বিধান, লিখিত আইন ও রাজকীয় আদেশের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। অপরাধের ধরন, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনি বিধানের ওপর নির্ভর করে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়।
দেশটিতে মাদক পাচার, বিশেষ করে মাদক আমদানি ও বিতরণের মতো গুরুতর অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে মাদক-সংশ্লিষ্ট সব অপরাধের শাস্তি এক নয়। অপরাধের প্রকৃতি ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে কারাদণ্ড, জরিমানা কিংবা আরও কঠোর শাস্তি দেওয়া হতে পারে।
ইচ্ছাকৃত হত্যার মামলায় কিসাসের বিধান অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে নির্দিষ্ট আইনি শর্তে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা ক্ষমা করলে বা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করলে মামলার পরিণতি পরিবর্তিত হতে পারে।
এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা এবং গুরুতর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার মতো অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, মৃত্যুদণ্ড জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় একটি শাস্তি।
মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপক প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। বিশেষ করে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রবণতা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংস্থাটি সব ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রেই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে।
দুই বাংলাদেশির পর গত শনিবার আরেক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য দিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। হাসান আল ফারাজ নামে ওই ব্যক্তিকে তার কিশোরবেলার এক অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
ইএসওএইচআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে কার্যকর হওয়া ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে ৮৩টি এমন অপরাধের জন্য, যাতে ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হত্যা করার অভিযোগ ছিল না।
সংস্থাটি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আইনি সহায়তা এবং আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে। এমন সুযোগ বিদেশিদের ক্ষেত্রে আরও সংকুচিত বলেও রয়েছে অভিযোগ।






