প্রবাসীদের পাসপোর্ট ইস্যু
স্বরাষ্ট্রের ক্ষমতায় পররাষ্ট্রের বাগড়া
- নিজেদের এখতিয়ারভুক্ত দাবি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পররাষ্ট্রের চিঠি
- ‘রুলস অব বিজনেস ও সচিবালয় নির্দেশমালার’ সরাসরি পরিপন্থী— দাবি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রবাসীদের পাসপোর্ট ইস্যু করা নিয়ে একরকম মুখোমুখি অবস্থায় চলে গেছে দুই মন্ত্রণালয়— স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। সমস্যার সমাধানে এরই মধ্যে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয়ের নিষ্ফল বৈঠক হয়েছে। বিধিবিধানের কথা উল্লেখ করে যার যার অবস্থানে অনড় ছিল দুপক্ষই। আরেকটি বৈঠকের পর সমাধানে পৌঁছানো না গেলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ চাওয়া হবে। ১৯৭৩ সাল থেকে এসব পাসপোর্ট ইস্যু করে আসছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
সূত্র জানাচ্ছে, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে ‘ভিয়েনা কনভেনশন ও রুলস অব বিজনেস’-এর কথা উল্লেখ করে এই এখতিয়ার নিজেদের বলে দাবি করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে সেই দাবিকে ‘রুলস অব বিজনেস ও সচিবালয় নির্দেশমালার’ সরাসরি পরিপন্থী বলে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে– বিদেশে অবস্থিত পাসপোর্ট ও ভিসা উইংয়ের প্রশাসন, আউটসোর্সিং চুক্তি, জনবল নিয়োগ এবং বায়োমেট্রিক ডেটা নিরাপত্তার সার্বিক কার্যক্রম ও সংবিধিবদ্ধ এখতিয়ার তাদেরই।
এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে গত ১৩ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিনিধি এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) উপস্থিত ছিলেন। সেখানে নিজ নিজ পক্ষের যুক্তি তুলে ধরে উভয়পক্ষই সরব ছিল। সমাধান না হওয়ায় শিগগিরই ফের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে বিষয়টি নিয়ে নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা।
জানা গেছে, গত ২৮ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাঠানো চিঠিতে পররাষ্ট্র বলেছে, ‘সৌদি আরব, ওমান ও কাতারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সব ধরনের কনস্যুলার সেবা দ্রুত ও সহজ করতে সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লেষ ছাড়াই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেবে— এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরব, ওমান এবং কাতারে বাংলাদেশ দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবা দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন, যা আগামী নভেম্বরের মধ্যে চালু হতে পারে।’
ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সৌদি আরবে পাসপোর্ট সেবার ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। কারণ হচ্ছে, দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সীমিত জনবলের মাধ্যমে প্রায় ৪০ লাখ মানুষকে সেবা দেওয়া হয়। বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কনস্যুলার ও অন্যান্য কল্যাণমূলক সেবা দ্রুত ও সহজীকরণের ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ কারণে এসব জায়গায় নতুন করে ৬৫টি এনরোলমেন্ট স্টেশন (নিবন্ধন কেন্দ্র) করা প্রয়োজন।’
প্রবাসীদের পাসপোর্ট ও ভিসা উইং নিজেদের একক এখতিয়ার দাবি করে চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘উল্লিখিত দূতাবাসগুলোতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত পাসপোর্ট ও ভিসা উইংগুলো সরাসরি দূতাবাসপ্রধানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। Vienna Convention on Diplomatic Relations-1961 (VCDR Art.3), (কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন-১৯৬১) ও Vienna Convention on Consular Relations-1963 (VCCR Art.5) (কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন-১৯৬৩) অনুযায়ী, বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবা দেওয়া-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর দায়দায়িত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনের দূতাবাস বা দূতাবাসপ্রধানদের ওপর। এ ছাড়াও, Rules of Business-1996 অনুযায়ী, এ-সংক্রান্ত দায়দায়িত্ব পালনের বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত।’ এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।
ওই চিঠি পাওয়ার পরপরই নড়েচড়ে বসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে আইনি পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করে গত ১৩ অক্টোবরের আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে তা উপস্থাপন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়েছে, ‘সৌদি আরব ৪০, ওমান ১৫ ও কাতারে ১০টিসহ ৬৫টি অতিরিক্ত ই-পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট ও বায়োমেট্রিক স্টেশন সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি নিজস্ব কর্তৃত্বে সৌদি আরবে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান (আল মামাল লজিস্টিকসের স্থলাভিষিক্ত নতুন সংস্থা) অনুমোদন দেওয়ার কথা উল্লেখ করে Rules of Business-1996 এবং ভিয়েনা কনভেনশন (VCDR-1961 ও VCCR-1963) অনুযায়ী, বিদেশে পাসপোর্ট ও ভিসা উইং-সংক্রান্ত সব কাজ পরিচালনাকে নিজেদের একক এখতিয়ার হিসেবে দাবি করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।’
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, ‘আইনি ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এসব দাবি সংবিধানের অনুচ্ছেদের ৫৫(৬) রাষ্ট্রপতির জারি করা Rules of Business-1996 (সংশোধিত ২০২৫) এবং সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪-এর সরাসরি পরিপন্থী। বিদেশে অবস্থিত পাসপোর্ট ও ভিসা উইংয়ের প্রশাসন, আউটসোর্সিং চুক্তি, জনবল নিয়োগ এবং বায়োমেট্রিক ডেটা নিরাপত্তার সার্বিক কার্যক্রম ও সংবিধিবদ্ধ এখতিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী, মিশনগুলোতে কনস্যুলার দায়িত্ব ও পাসপোর্ট-সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন। কিন্তু সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক) অনুযায়ী, বাংলাদেশ একটি Dualist State (দ্বৈতবাদী রাষ্ট্র)। সেই হিসেবে আন্তর্জাতিক চুক্তি বা কনভেনশন দেশের অভ্যন্তরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয় এবং দেশের প্রজ্ঞাপন/আইনের ওপর প্রাধান্য পায় না। VCDR (Art. 3) ও VCCR (Art. 5) কেবল স্বাগতিক রাষ্ট্র (Host State)-এর ভূমিতে প্রেরক রাষ্ট্রের কূটনৈতিক অধিকার নির্দেশ করে; কিন্তু প্রেরক রাষ্ট্র (Sending State)-এর অভ্যন্তরে কোন মন্ত্রণালয় কাজ করবে, তা আন্তর্জাতিক আইন নির্ধারণ করে না।’
মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার নির্ধারণের একমাত্র নথি Rules of Business। এটি লঙ্ঘনের ঘটনা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অবহিত করা হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে ওই বৈঠকে উপস্থাপিত স্বরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানালেন, পাসপোর্ট প্রদানকারী সরকারি একমাত্র কর্তৃপক্ষ ‘ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সংস্থা। এ-সংক্রান্ত সব কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজও তাদের কার্যপরিধিতে স্পষ্ট করা আছে। দুটি মন্ত্রণালয়ই রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এটি আসলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট ও কনস্যুলার সেবা দ্রুত ও সহজ করতে আইটসোর্সিং বা এজেন্ট নিয়োগের বিষয় আছে। আর এখানে এই নিয়োগ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করলেও স্বরাষ্ট্রের প্রশাসনিক অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এই অবস্থানে বিষয়টির একক কর্তৃত্ব চায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।



