যাঁরা ভবিষ্যৎ গড়েন, তাঁরা কোথায়?
- বিলবোর্ডে বিজ্ঞানী, আর আমরা যাঁদের ‘তারকা’ বানাই

চীনে বিলবোর্ডে স্থান পেয়েছে বিজ্ঞানীদের ছবি। ছবি: সংগৃহীত
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে, কবি শঙ্খ ঘোষের এর কবিতায় একটা লাইন আছে ‘ক্লান্ত আমার মুখোশ শুধু ঝুলতে থাকে বিজ্ঞাপনে’, আমাদের শহরের বিলবোর্ডে বা ডিজিটাল পর্দায় কাদের মুখ অথবা মুখোশ আমাদের সামনে বেশি দৃশ্যমান হয়? মুখোশ বলতে চরিত্র বুঝিয়েছি। সিনেমার তারকা, ফ্যাশন আইকন বা খেলোয়ারদের মুখই বেশি দেখি। কিন্তু বিজ্ঞানী, গবেষক, স্থপতি কিংবা শিল্পীর মুখ সেখানে ঠিক কতটা দেখা যায়? বিলবোর্ড বা জনপরিসরের প্রচারণায় যাদের দেখা যায়, তাদের শ্রেণিগত তালিকাটি খুব একটা বদলায় না। প্রশ্নটি শুধু বিলবোর্ডে কার ছবি থাকবে তা নিয়ে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বড় একটি প্রশ্ন। আমরা একটি সমাজ হিসেবে কাকে সাফল্যের প্রতীক বানাচ্ছি, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কাকে অনুসরণ করতে বলছি। একটি সমাজ কাদের বারবার সামনে আনে, সেটিও এক ধরনের বার্তা। আমরা যাঁদের বারবার দেখি, তাঁদেরই ধীরে ধীরে সাফল্য ও অনুকরণের প্রতীক হিসেবে মেনে নিই। শিশুরা বিলবোর্ডের মুখ দেখে ভবিষ্যতের নিজেকে দেখতে থাকে।
চীনের শহরে বিজ্ঞানীদের মুখ
সাম্প্রতিক সময়ে চীনে এক ভিন্ন দৃশ্য দেখা গেছে। বিজ্ঞাপনের জন্য সংরক্ষিত বড় স্ক্রিন ও বিলবোর্ডে জায়গা পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীদের নাম মিডিয়ায় আসে কদাচিত গবেষণার সাফল্য প্রচারের সময়। কখনো পাঠ্যবইয়ে পাওয়া যেত সেসব নাম। সম্প্রতি হেনান প্রদেশের ঝেংঝৌ শহরের একটি মেট্রো স্টেশনে দেখা গেছে চীনের মহাকাশ ও রকেট কর্মসূচির প্রধান স্থপতি ছিয়েন শুয়েসেন এবং পরমাণু বিজ্ঞানী দেং চিয়াসিয়েনের ছবি। এদের সঙ্গে সংকর ধান প্রযুক্তির পথিকৃৎ ইউয়ান লংপিং এবং ম্যালেরিয়া চিকিৎসায় যুগান্তকারী অবদান রাখা নোবেলজয়ী তু ইউইউর ছবিও বিভিন্ন শহরের জনপরিসরে জায়গা পেয়েছে। প্রচারণাটি প্রথমে শানডংয়ে শুরু হয়ে পরে হেনান, আনহুই, ইনার মঙ্গোলিয়া, জিয়াংসিসহ আরও কয়েকটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
এই প্রচারণার প্রাথমিক উদ্দেশ্য মনে হতে পারে, কয়েকজন বিখ্যাত বিজ্ঞানীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। আসলে তা নয়, বরং বিজ্ঞান ও গবেষণাকে গবেষণাগার থেকে বের করে গণমানুষের কাছে দৃশ্যমান করে স্বীকৃতি দেওয়া। যেখানে সাধারণত তারকা বা বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন দেখা যায়, সেখানেই এবার উঠে এসেছে জ্ঞান ও উদ্ভাবনের মুখ। এই নতুন ‘সেলিব্রেটি’দের কেউ কেউ রকেটবিজ্ঞান, কেউ চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবদান রেখেছেন। এমন ভিন্ন ফিল্ডের দুজন কীর্তিমান মানুষকে পাশাপাশি জনপরিসরে হাজির করার মধ্য দিয়ে চীন অভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। জাতীয় নায়ক শুধু বিনোদনজগতের পরিচিত মুখ নন, গবেষণাগারে বসে জ্ঞান তৈরি করা মানুষও জাতীয় নায়ক।
আর বাংলাদেশে?
চীনের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্যও একটি জরুরি প্রশ্ন সামনে আনে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সরকারি প্রচারণায় প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা-অভিনেত্রীর পাশাপাশি রিলস-শর্টসের মাধ্যমে লাখো অনুসারীর অধিকারী ইনফ্লুয়েন্সারদের নির্বাচন করতে দেখা গিয়েছে। কখনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের কয়েক ধাপ এগিয়ে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলি। একথা ঠিক পুঁজিবাদী সংস্কৃতি এই অভ্যাস অস্বাভাবিক কিছু নয়। একই সঙ্গে তরুণ জনপ্রিয় মুখের যোগাযোগক্ষমতা তরুণদের আগ্রহী করে তোলে, যা বিপণনে সাধারণ বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে এই প্রশ্নও তৈরি হয় যে, এই অনুসারীমুখী জনপ্রিয়তা আমাদের তারকার ধারণা নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদে পিছিয়ে দিচ্ছে কিনা।
শিশু-কিশোর, তরুণ প্রজন্মের সামনে কারা রোল মডেল হিসেবে উপস্থিত হতে পারে। কেবলই জনপ্রিয় ফ্যাশন আইকন নাকি আরও কিছু মানদণ্ড বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে। চোখ মেললেই দেখা যাবে, বাংলাদেশে একজন অসাধারণ শিক্ষক হয়তো কয়েক দশক ধরে শত শত শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিচ্ছেন। কোনো গবেষক হয়তো দেশের কৃষি, স্বাস্থ্য বা জলবায়ু সংকটের সমাধান খুঁজছেন। কিন্তু তাঁদের মুখ কি আমাদের শহরের বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিনে দেখা যায়?
একটি শিশু যখন প্রতিদিন তারকার ছবি দেখে, সে তারকা হতে চাইতে পারে। প্রতিদিন ক্রিকেটারের ছবি দেখলে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। তাহলে একজন বিজ্ঞানী বা শিক্ষকের মুখ যদি একইভাবে প্রতিদিন তার চোখের সামনে থাকে, তার স্বপ্নের তালিকায় হয়তো বিজ্ঞানী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরও প্রবল হয়ে উঠবে। এই আলাপের উদ্দেশ্য বিনোদনজগতের তারকাদের সরিয়ে দেওয়া নয় কিংবা বিদ্যমান তারকাদের প্রতিদ্বন্দী তৈরি করা নয়। শিল্পী, অভিনেতা, খেলোয়াড়দের সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। প্রশ্নটা হলো, রোল মডেলের তালিকাটি যদি কেবল জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে তৈরি হয়, তাহলে জ্ঞান ও গবেষণার মানুষের জায়গা কোথায়? এই সমাজ ও দেশ এগিয়ে নেওয়ার জন্য যারা নীরবে কাজ করেন তারা কি ব্যাকস্টেজেই চিরকাল থাকবেন?
কিছু মুখকে তো আমরাই সামনে আনতেই পারি। যেমন, কলেরা ও টিকা গবেষণায় বিশ্বখ্যাত ড. ফিরদৌসী কাদরী। যিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, দেশের বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্র করেও বিশ্বমানের গবেষণা করা যায়। অণুজীববিজ্ঞানী ড. সেঁজুতি সাহা কোভিডকালে বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করেন। তিনি দেশেই আধুনিক গবেষণার সক্ষমতা গড়ে তোলার পথ দেখান-২০২২ সালে দ্য ল্যানসেট তাঁর ওপর প্রোফাইল প্রকাশ করে, যা দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী এভাবে তুলে ধরা প্রথম বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর ঘটনা। স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার, বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্থাপত্য পুরস্কার, দুইবার জেতা একমাত্র বাংলাদেশি।
রোল মডেল শুধু বিজ্ঞানী বা স্থপতিই হবেন, তা নয়। চিত্রশিল্পী সদ্যপ্রয়াত মুস্তাফা মনোয়ার বাংলাদেশে পাপেট শিল্পের জনক হিসেবে শিশুদের কল্পনাশক্তি গড়ে তুলেছেন এবং শহীদ মিনারের পরিচিত লাল সূর্যের অন্যতম রূপকার ছিলেন তিনি নিজেই। কিংবা বিসিএস ছেড়ে প্রাথমিকের শিক্ষক বুয়েটের নায়লা, যিনি ইঞ্জিনিয়ার হতে পারতেন, কিন্তু প্রথা ভেঙ্গে হয়েছেন প্রাথমিকের শিক্ষক। কী অসাধারণ ঘটনা। অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছে যারা প্রযুক্তি ক্ষেত্রে দেশের মুখ উজ্জ্বল করে যাচ্ছেন। তাদের আমরা তারকা হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি করছি কই।
রোল মডেলের তালিকাটা আরও বড় হোক
একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির ওপর তৈরি হয় না। তৈরি হয় চিন্তা, শিক্ষা, সৃজনশীলতা, গবেষণা ও শিল্পের সম্মিলনে। আমরা অভিনেতা, গায়ক, খেলোয়াড় বা জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতাদের আড়ালে রাখার কথা বলছি না। আমরা শুধু বলতে চাই, তালিকাটা আরও বড় হোক। সিনেমার তারকার পাশে থাকুক বিজ্ঞানী। ক্রীড়াবিদের পাশে থাকুক গবেষক। ইনফ্লুয়েন্সারের পাশে থাকুক শিক্ষক। অভিনেতার পাশে থাকুক চিকিৎসক। আর তাঁদের পাশে থাকুক শিল্পী, সাহিত্যিক, স্থপতি ও উদ্ভাবক। কারণ একজন জনপ্রিয় অভিনেতা একজন তরুণকে অভিনয়ের স্বপ্ন দেখাতে পারেন, একজন ক্রীড়াবিদ তাঁকে খেলোয়াড় হওয়ার অনুপ্রেরণা দিতে পারেন, কিন্তু একজন বিজ্ঞানী তাঁকে প্রশ্ন করতে শেখাতে পারেন, একজন শিক্ষক তাঁকে জানতে শেখাতে পারেন, একজন শিল্পী তাঁকে সমাজকে অন্য চোখে দেখতে শেখাতে পারেন। একটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য এই সব ধরনের অনুপ্রেরণাই প্রয়োজন।
চীনের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো বিজ্ঞানীদের বিলবোর্ডে তুলে ধরা নয়। বরং শিক্ষা হলো, একটি সমাজ তার জনপরিসরে কাদের জায়গা দেয়, সেটিও এক ধরনের শিক্ষা। আমরা যদি সন্তানদের বলি, ‘বিজ্ঞানী হও’, ‘গবেষণা করো’, ‘শিক্ষক হও’, ‘দেশের সমস্যা সমাধান করো’, তাহলে যাঁরা ইতিমধ্যে সেই পথ তৈরি করেছেন, তাঁদেরও তরুণদের সামনে দৃশ্যমান করতে হবে। শুধু পাঠ্যবইয়ে তাঁদের ছবি ছাপলেই হবে না, শুধু জাতীয় পুরস্কার দিলেই হবে না। তাঁদের গল্পকে নিয়ে আসতে হবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, মেট্রো স্টেশনে, বিমানবন্দরে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, শহরের বিলবোর্ডে, ডিজিটাল স্ক্রিনে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কারণ আমরা যাঁদের প্রতিদিন দেখি, তাঁদেরই ধীরে ধীরে অনুসরণ করতে শিখি।
চীনের শহরের বড় স্ক্রিনে বিজ্ঞানীদের মুখ উঠে আসার ঘটনা তাই শুধু একটি দেশের কীর্তিমানদের নিয়ে প্রচারণা নয়। এটি আমাদের জন্যও একটি আয়না। সেই আয়নায় তাকিয়ে নিজেদের প্রশ্ন করা দরকার, আমরা আমাদের তরুণদের সামনে কাদের তুলে ধরছি? আমরা কাদের ‘তারকা’ বানাচ্ছি? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যাঁরা ভবিষ্যৎ গড়েন, তাঁরা কোথায়?






