সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের আগে কী করেছে কনস্যুলেট, প্রশ্ন এইচআরএফবির

হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশের লোগো
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনকে আগে থেকে অবহিত না করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি)। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ওই দুই নাগরিকের ন্যায়বিচার, কার্যকর আইনি সহায়তা ও কনস্যুলার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এইচআরএফবির আহ্বায়ক ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমানের সই করা বিবৃতিতে দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহি চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বলা হয়েছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির পরিবারকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে।
সংগঠনটি একটি জাতীয় দৈনিকের ১৯ ও ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদন উল্লেখ করে জানায়, গত ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটের শ্রম উইং থেকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ১৮ অক্টোবরের একটি চিঠি অনুযায়ী, পৃথক অভিযোগে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে আটক ছিলেন ওই দুই নাগরিক।
৩০ সেপ্টেম্বর কনস্যুলেটের পাওয়া বন্দিদের তালিকায় তাদের সাজার তথ্য উল্লেখ ছিল না। অথচ অন্য বন্দিদের ক্ষেত্রে সাজার বিবরণ দেওয়া হয়েছিল। সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটকে আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেনি বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে এইচআরএফবির প্রশ্ন, ৩০ সেপ্টেম্বর বন্দিদের তালিকা পাওয়ার পর কনস্যুলেট ওই দুই নাগরিকের বিষয়ে খোঁজ নিতে কী উদ্যোগ নিয়েছিল। অন্য বন্দিদের সাজার তথ্য উল্লেখ থাকলেও তাদের ক্ষেত্রে তা ফাঁকা থাকার কারণ অনুসন্ধান করা হয়েছিল কি না, তা-ও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে কী রায় দেওয়া হয়েছিল এবং কী সাজা হয়েছিল, তা জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছে এইচআরএফবি।
সংগঠনটির মতে, সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশি মিশনকে অবহিত না করলেও তা দিয়ে কনস্যুলেটের ভূমিকা ও দায়িত্বের প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয় না। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ওই দুই নাগরিকের পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তা চেয়ে কনস্যুলেটে যোগাযোগ না করার কথা বলা হয়েছে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ না করার বিষয়টি কনস্যুলেটের নিজস্ব উদ্যোগ ও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে না।
এইচআরএফবি বলেছে, বাংলাদেশ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) পক্ষভুক্ত। চুক্তিটির ৬ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকারের সুরক্ষা এবং মৃত্যুদণ্ড আরোপের ক্ষেত্রে কঠোর সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৪ অনুচ্ছেদে ন্যায়বিচার, আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ এবং আইনগত সহায়তা পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। অন্যদিকে, ১৯৬৩ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদে আটক বিদেশি নাগরিকের কনস্যুলার যোগাযোগ ও সহায়তার অধিকার সম্পর্কিত বিধান রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ওই দুই নাগরিক নিজেদের পছন্দের আইনজীবী নিয়োগ করতে পেরেছিলেন কি না, আইনজীবীর সঙ্গে স্বাধীনভাবে ও গোপনীয়তার সঙ্গে পরামর্শের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, বিচারপ্রক্রিয়া বুঝতে প্রয়োজনীয় দোভাষীর সহায়তা পেয়েছিলেন কি না এবং আপিল ও ক্ষমা প্রার্থনার কার্যকর সুযোগ ভোগ করতে পেরেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করে সংগঠনটি।
তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া ও রায়ের ভিত্তি সম্পর্কেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে এইচআরএফবি। যদিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কনস্যুলেট এরই মধ্যে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি ‘নোট ভার্বাল’ পাঠিয়ে রায়ের অনুলিপি ও মামলার বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। এইচআরএফবি মনে করে, বাংলাদেশ সরকারকে কূটনৈতিক পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি উত্থাপন করে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথি ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা সংগ্রহ করতে হবে।
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষায় কূটনৈতিক মিশনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য বলে মনে করে এইচআরএফবি। সংগঠনটি বলেছে, অপরাধের অভিযোগে আটক কিংবা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।





