১০০ টাকা কর আদায়ে বাংলাদেশে ব্যয় ২১ পয়সা, এশিয়ার অন্য দেশে কত?

প্রতীকী ছবি
যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজস্ব আহরণের জন্য সরকারকে একটি প্রশাসনিক অবকাঠামো পরিচালনা করতে হয়, যার পেছনে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা পরিচালন ব্যয় রয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে ‘কস্ট অব কালেকশন রেশিও’ বলা হয়।
জাতীয় রাজস্ব আহরণে প্রশাসনিক এ ব্যয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বেশ সাশ্রয়ী অবস্থানে রয়েছে। প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করতে বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হয় মাত্র ২১ পয়সা, যা এ অঞ্চলের দেশগুলোর তুলনায় সর্বনিম্ন।
তবে এটি বেশ খুশির খবর হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে তা মোটেও স্বস্তির নয়। তারা বলছেন, কম খরচ হওয়া মানেই যে প্রশাসন অত্যন্ত দক্ষ—বিষয়টি এমন নয়, বরং এটি মূলত কর জালের সংকীর্ণতা, জনবল সংকট এবং কাঠামোগত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। যার প্রভাব পড়ে কর আহরণে। ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ঘাটতি থেকে যায় কর আদায়ে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া অর্থ মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির এক কার্যপত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করতে প্রশাসনিকভাবে খরচ হয় মাত্র ২১ পয়সা। অথচ উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিতে এই ব্যয়ের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তথ্য অনুযায়ী, উন্নত দেশ জাপান প্রতি ১০০ টাকার কর আহরণে ব্যয় করে ১ টাকা ৩ পয়সা। এ ছাড়া থাইল্যান্ড ৭১ পয়সা ও প্রতিবেশী ভারত ৬০ পয়সা ব্যয় করে প্রতি ১০০ টাকা আহরণে।
এশিয়ার অন্য দেশে কত ব্যয়
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং নিজ নিজ দেশের রাজস্ব কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কায় প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করতে সাধারণত ১ টাকা থেকে ১.৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। পাকিস্তানের ফেডারেল বোর্ড অব রেভিনিউয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব সংগ্রহে খরচ সাধারণত ৪০ পয়সা থেকে ৬০ পয়সার মধ্যে থাকে।
নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগ ও শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ে খরচ প্রায় ১ টাকা থেকে ১.২৫ টাকা পড়ে। ভুটানের ডিপার্টমেন্ট অব রেভিনিউ অ্যান্ড কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব সংগ্রহে খরচ প্রায় ১.৫০ টাকা থেকে ২.০০ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
সংসদীয় কমিটির দ্বিতীয় এ বৈঠকে তুলে ধরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, সরকারের মোট রাজস্বের ৮৬ শতাংশই আসে এনবিআর থেকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, যা গত ২৫ বছরে ২০.৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেট ব্যয়ের ৬৪.৮ শতাংশ এবং মোট রাজস্বের ৮৬.৯ শতাংশ।
তবে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরা হয় বৈঠকে।
জানানো হয়, এনবিআরের মোট জনবলের ৫৮ শতাংশ পদ পূর্ণ রয়েছে এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পদ শূন্য। আয়কর বিভাগে ১২ হাজার ৭৬৪টি অনুমোদিত পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই খালি পড়ে আছে। করনীতি এবং কর প্রশাসন একই কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হওয়ায় দীর্ঘকাল ধরে কার্যকারিতায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া রিস্ক-ভিত্তিক অডিট, ই-টিন, ই-রিটার্ন, ই-টিডিএস এবং এনআইডি, ভূমি নিবন্ধন ও বিআরটিএ’র সঙ্গে এপিআইভিত্তিক তথ্য বিনিময়ের একটি সমন্বিত করদাতা ডাটাবেজের অভাবের কথা তুলে ধরা হয়।
এনবিআর জানায়, বর্তমানে ১ কোটি ৩০ লাখ টিনধারীর মধ্যে মাত্র ৪৭ লাখ রিটার্ন দাখিল করেন এবং ২ শতাংশেরও কম করদাতা ঝুঁকিভিত্তিক অডিটের আওতায় আসেন। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে এআইভিত্তিক করদাতা শনাক্তকরণ, টিআইএন ডাটাবেজ ক্লিনজিং, হাই-নেট-ওয়ার্থ ব্যক্তিদের প্রোফাইলিং এবং ট্রান্সফার প্রাইসিং কার্যকর করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কম খরচে রাজস্ব আদায় করলেই তাকে প্রশাসনিক দক্ষতা বলা যায় না। ভুটান বা নেপালে খরচ কিছুটা বেশি হলেও তারা করের আওতা সম্প্রসারণে জোর দেয়, পক্ষান্তরে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে কম খরচে রাজস্ব আদায়ের পেছনে মূলত বড় করদাতা ও শুল্কের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা এবং কর ফাঁকির বড় সুযোগ লুকিয়ে রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য (করনীতি) সৈয়দ আমিনুল করিম আগামীর সময়কে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের কর আদায়ের প্রত্যক্ষ খরচ কম হওয়ার মানে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং কর জালের সংকীর্ণতারই প্রতিফলন। এর মানে হচ্ছে রাজস্ব আহরণে আমাদের পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নেই। বেশি রাজস্ব আহরণের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত অবকাঠামো, জনবল এবং প্রশিক্ষণ নেই। যতটুকু কর আসে তার বেশিরভাগই স্বেচ্ছায় বা স্বাভাবিকভাবে আসে। সেজন্য কর আদায়ে যথেষ্ট বিনিয়োগ দরকার। এতে খালি চোখে ব্যয় বাড়ছে দেখা হলেও তার সুফল হিসেবে করও বেশি আদায় হবে।




