কর বাড়তেই ব্রিটেন ছাড়ছেন ধনকুবেররা
- দুই বছরে সরে গেছে ১২ হাজার কোটি পাউন্ডের সম্পদ

টাকা সব সময় স্যুটকেস গুছিয়ে দেশ ছাড়ে না, কখনও তার মালিকই ঠিকানা বদলান। আর সেই ঠিকানা বদলের সঙ্গে বদলে যায় করের হিসাব, বিনিয়োগের গন্তব্য এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজস্ব। ব্রিটেনে এখন সেই অঙ্ক নিয়েই উদ্বেগ। গত দুই বছরে দেশ ছেড়েছেন বা ব্রিটেনের সঙ্গে কর-আবাসনের সম্পর্ক শিথিল করেছেন এমন অতিধনীদের সম্মিলিত সম্পদের মূল্য প্রায় ১২ হাজার কোটি পাউন্ড।
সোমবার (৫ অক্টোবর) প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার্স ইনডেক্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর এক ডজনের বেশি ধনকুবের ব্রিটেন ছেড়েছেন বা দেশটির সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক কমিয়েছেন। তাদের সম্মিলিত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পদের মূল্য প্রায় ১২০ বিলিয়ন পাউন্ড।
তবে এই ১২০ বিলিয়ন পাউন্ড পুরোপুরি নগদ অর্থ বা বিনিয়োগ হিসেবে ব্রিটেন থেকে বেরিয়ে গেছে, এমন প্রমাণ নেই। এটি মূলত দেশত্যাগী বা কর-আবাসন বদলানো ধনীদের মোট সম্পদের মূল্য। ফলে সংখ্যাটি মূলধন পাচারের সরাসরি হিসাব নয়, বরং সম্ভাব্য কর, বিনিয়োগ ও ব্যয়ের ভিত্তি সরে যাওয়ার একটি সূচক।
সবচেয়ে বড় নাম ইস্পাত ব্যবসায়ী লক্ষ্মী মিত্তাল। তার সম্পদের মূল্য ৩০ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি। গত বছর তিনি ব্রিটেন থেকে কর-আবাসন সুইজারল্যান্ডে সরান এবং অধিকাংশ সময় দুবাইয়ে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন।
টেলিযোগাযোগ উদ্যোক্তা শ্রাবিন ভারতী মিত্তালের পারিবারিক সম্পদের অংশ প্রায় ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। অ্যাস্টন ভিলার সহমালিক নাসেফ সাওইরিসও ব্রিটেন ছেড়েছেন।
সর্বশেষ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ডেভিড রুবেন। প্রায় ৯ দশমিক ৯ বিলিয়ন পাউন্ড সম্পদের মালিক রুবেন গ্রীষ্মে মোনাকোয় চলে গেছেন। তবে তার সম্পদ ওই ১২০ বিলিয়ন পাউন্ডের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত নয়।
আরেক আলোচিত নাম হেজ ফান্ড ব্যবসায়ী ক্রিস রোকোস। ২০২৫ সালে তিনি প্রায় ৩৩ কোটি পাউন্ড কর দিয়ে ব্রিটেনের তৃতীয় বৃহত্তম ব্যক্তিগত করদাতা হয়েছিলেন। এখন তিনি গ্রিসে কর-আবাসন সরাচ্ছেন, যেখানে বিদেশি ধনীদের জন্য বছরে এক লাখ ইউরোর নির্দিষ্ট করব্যবস্থা রয়েছে।
এই প্রবণতার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ‘নন-ডম’ করব্যবস্থা বাতিল। এর ফলে দীর্ঘদিন ব্রিটেনে বসবাস করেও বিদেশের আয় ও সম্পদের ক্ষেত্রে বিশেষ করসুবিধা পাওয়া ব্যক্তিদের ওপর নতুন নিয়ম কার্যকর হয়। পাশাপাশি মূলধনি মুনাফা, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার কর নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। উল্লেখ্য, ‘নন-ডম’ ছিল ব্রিটেনের এমন একটি করব্যবস্থা, যেখানে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেও বিদেশকে স্থায়ী আবাস হিসেবে দেখানো কিছু ব্যক্তি বিদেশে অর্জিত আয় ও সম্পদের ওপর বিশেষ করসুবিধা পেতেন।
ফোনসফোরইউ প্রতিষ্ঠাতা জন কডওয়েল পরিস্থিতিকে “বিপর্যয়কর” বলে মন্তব্য করেছেন। সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গ্রেশাম হাউসের প্রধান টনি ডালউডের মতে, ব্যক্তি ও কোম্পানির ওপর কর বাড়তে থাকলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির “সুস্থ চক্র” ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে সরকার বলছে, ব্রিটেন এখনও প্রতিভা ও বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য। সরকারি বক্তব্যে বলা হয়েছে, দেশটির স্থিতিশীল করব্যবস্থা, স্থিতিশীল ও শক্তিশালী পুঁজিবাজার, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় ও দক্ষ কর্মশক্তি এখনও বড় শক্তি।
তাই বিতর্কটি শুধু ধনীরা কোথায় থাকছেন, তা নিয়ে নয়। আসল প্রশ্ন, তাদের সঙ্গে ভবিষ্যতের কর, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের কতটা ব্রিটেনের সীমানার বাইরেও চলে যাচ্ছে।



