ভেজা চোখে সহপাঠীদের স্মরণ
তুই তো বাসায় গিয়ে আমাকে মেসেজ দিলি না...
- মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘আমি তোমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী মীম। মনে আছে ২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের কথা! যেদিন আমরা একসঙ্গে স্কুলে গিয়েছিলাম। একই বেঞ্চে পাশাপাশি বসেছিলাম। কিন্তু ছুটির পর কী যে হয়েছিল তা আজ পর্যন্ত বুঝে ওঠার ক্ষমতা আমার হয়ে ওঠেনি...। আমি কল্পনাও করতে পারি নাই আমাকে তুমি শেষ কথা এটাই বলবা যে, তুই বাসায় গিয়ে আমাকে মেসেজ দিস। আমি তোকে কখনোই ভুলতে পারব না। কারণ তুই ছিলি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু ...।’
বাড়ি পৌঁছে মেসেজ দেওয়ার কথা ছিল আনিকার। কিন্তু সেই মেসেজ আর কখনো আসেনি। মীম কল্পনাই করতে পারেনি ছুটির ঘণ্টার পর বন্ধুকে বিদায় জানানোটাই হবে তাদের শেষ কথা।
উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভয়াবহ বিমান ট্র্যাজেডিতে মারা যায় আনিকা। তাকে স্মরণ করে এই মর্মস্পর্শী চিঠি লিখেছেন তারই সহপাঠী মীম। চিঠির পরের অংশটুকু যেন শত শত দর্শনার্থীর বুক চিরে এক তীব্র হাহাকার জাগিয়ে তোলে।
কালো ব্যাচ পরে হাজির হয়েছিলেন সবাই। শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের শোক, স্মৃতি আর হারানোর বেদনায় প্রাঙ্গণ জুড়ে নেমে আসে গভীর নীরবতা। সবার চোখ ছিল অশ্রুসজল
মীম চিঠিতে লিখেছে, একই বেঞ্চে পাশাপাশি বসে গল্প করা, টিফিন ভাগাভাগি আর ছুটির ঘণ্টা বাজলেই একসঙ্গে বাড়ি ফেরার স্মৃতি। একটি ভয়াবহ ট্র্যাজেডি মুহূর্তে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে তাদের হাসিমুখ। স্তব্ধ করে দিয়েছে শৈশবের অগুনতি স্বপ্ন।
প্রয়াত বান্ধবীর শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি মীম। হৃদয়ের সমস্ত আবেগ উজাড় করে লিখেছে— ‘আমি কখনো ভাবতে পারি নাই তোকে হারিয়ে ফেলব। আমি তোর জায়গা অন্য কাউকে দিতে পারব না। জীবনে কত বন্ধু আসবে-যাবে; কিন্তু তোর মতো আর কেউ আসবে না। তুই ছিলি আমার চাঁদের মতো, সেই চাঁদ যা এখন অমাবস্যা। কোনো দিন সেখানে পূর্ণিমার চাঁদ উঠবে না ...।’
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির বছরপূর্তিতে স্কুলটিতে আয়োজন করা হয়েছিল স্মরণসভার। সেখানে এক কোণে টাঙানো ‘স্মৃতি দেয়ালিকার’ সামনে গিয়ে যেন থমকে দাঁড়িয়েছিলেন সবাই। ছোট ছোট হাতে লেখা অজস্র চিঠি, যার প্রতিটিতে জমে আছে প্রিয় সহপাঠী ও স্বজন হারানোর দীর্ঘশ্বাস। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হৃদয় ছুঁয়ে গেছে মীমের লেখা এই চিঠিটি। পরম মমতায় নীল বর্ডার দেওয়া কাগজের পাতায় মীম লিখেছে তার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবীকে।
স্মরণসভাটি শুরু হয় ঠিক সকাল সাড়ে ৯টায়। কালো ব্যাচ পরে হাজির হয়েছিলেন সবাই। শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের শোক, স্মৃতি আর হারানোর বেদনায় প্রাঙ্গণ জুড়ে নেমে আসে গভীর নীরবতা। সবার চোখ ছিল অশ্রুসজল।
স্মরণসভায় আসা শিক্ষক ও সহপাঠীরা মীমের চিঠিটি পড়ার সময় নিজেদের ধরে রাখতে পারেননি।
একজন শিক্ষক আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, ‘ওদের এই ছোট ছোট চিঠিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটা ট্র্যাজেডি কেবল কিছু জীবন কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় নিষ্পাপ শৈশবের রঙিন স্বপ্ন আর প্রতিদিনের চেনা পথচলা। দেয়ালিকায় লেখা মীমের শেষ বাক্যটি যেন পুরো মাইলস্টোন পরিবারেরই চাওয়া— তুই ওপারে ভালো থাক ইনশাআল্লাহ্। আমি একদিন তোর কাছে আসব… দোয়া করি আল্লাহ তোমাকে জান্নাত দান করুক। আমিন।’
সেই দিনের দুঃসহ স্মৃতি স্মরণ করেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মনিরুল ইসলাম মোল্লা। ‘আমি ও আমার মেয়ে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে বেঁচে যাই। আমাদের ঠিক ২০ গজ সামনেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। নিজের সন্তানকে নিরাপদ জায়গায় রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ি উদ্ধার কাজে।’
শিশুদের বাঁচানোর অভিজ্ঞতা স্মরণ করতে গিয়ে চোখে পানি রাখতে পারেননি এই শিক্ষক। বললেন, ‘একেকটি শিশুর গায়ে হাত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছে তাদের শরীরে ২০০ ডিগ্রি তাপমাত্রা।’
উদ্ধার করতে গিয়ে যে শিক্ষকরা মারা গেছেন তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দেওয়ার দাবি জানান তিনি। ‘ওনারা সেদিন চাইলেই ওখান থেকে বের হয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু নিজের জীবন বিপন্ন করে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন সব শিশুদের বাঁচাতে।’
সেদিন নিজের সন্তানকে খোঁজার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন প্রাথমিক শাখার শিক্ষক ফারজাহা কাবেরী। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘আমার নিজের সন্তান এই স্কুলের শিক্ষার্থী। মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে সে প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু দুর্ঘটনার পর প্রায় দেড় ঘণ্টা আমি তাকে খুঁজে পাইনি। জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময় ছিল সেই দেড় ঘণ্টা। নিজের সন্তানকে খুঁজতে গিয়ে মনে হচ্ছিল চারপাশের প্রতিটি আহত শিশুই যেন আমার সন্তান। যাকে যেভাবে পেরেছি নিজের সন্তানের মতোই উদ্ধার করার চেষ্টা করেছি।’
শিক্ষকদের এমন আত্মত্যাগ অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ও উপদেষ্টা কর্নেল নুরন্ নবী (অব.)। সমাপনী বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, ‘যাদের হারিয়েছি তাদের আর কখনো ফিরে পাব না। তবে তাদের স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবে। শিশুদের বাঁচাতে নিজের জীবন আগুনে উৎসর্গ করার মতো সাহস কেবল একজন প্রকৃত শিক্ষকের পক্ষেই সম্ভব। আমরা তাদের কোনোদিন ভুলব না। তাদের উৎসর্গ করা জীবনবোধ নিয়েই আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই।’







