ব্রজমোহন কলেজের প্রয়োজন ১৫০ কোটি টাকা
- ভবনগুলো বেহাল
- পরিবহন সংকট চরমে
- প্রধানমন্ত্রীর কাছে বরাদ্দের আবেদন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরিশালের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ। নানা সংকটের মুখে বেহাল অবস্থা প্রতিষ্ঠানটির। প্রতিনিয়ত নানা দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখেও মিলছে না সুফল। ভবনগুলোর রুগ্ণ দশা। ঝুঁকিপূর্ণ ছাত্রাবাসগুলোতে ঠাঁই শিক্ষার্থীদের। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কলেজের সংকট নিরসনে ১৪৯ কোটি ৯০ লাখ টাকার বরাদ্দ চেয়ে আবেদন জমা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাতেও মেলেনি কোনো জবাব। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ কলেজ প্রশাসন।
কলেজ সূত্র জানায়, বরিশাল বিভাগ তথা দক্ষিণাঞ্চলের সর্বোচ্চ শিক্ষার্থী এই কলেজে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের চার অনুষদের ২২টি ডিপার্টমেন্ট, ডিগ্রি ও উচ্চ মাধ্যমিক মিলিয়ে প্রায় ৩৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী আছে এই প্রতিষ্ঠানে। ক্যাম্পাসের তিনটি ও বাইরে সচল দুটি ছাত্রাবাস। সবগুলোর অবস্থাই বেহাল। সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। জলাবদ্ধতা ও একাডেমিক ভবন সংকট কেবলই বাড়ছে।
জানা গেছে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন জমা দিয়েছেন অধ্যক্ষ। তাও প্রায় ৬ মাস আগে। ওই আবেদনে কলেজের মহাত্মা অশ্বিনী কুমার হল, ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক হল, জীবনানন্দ দাশ হল ও বনমালী গাঙ্গুলী ছাত্রী নিবাস সংস্কারের জন্য ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা, পদার্থবিজ্ঞান ভবন ও রসায়ন একাডেমিক ভবন সংস্কারের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা, ক্যাম্পাসের ড্রেনসহ রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার বাবদ ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক ভবন সংস্কারে ৫০ লাখ টাকা, কলেজের দুটি গেট নির্মাণে ৫০ লাখ টাকা, ১০-তলা হোস্টেল ভবন নির্মাণে ৬০ কোটি টাকা, নতুন একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবন নির্মাণে ৬৫ কোটি টাকা, ক্যাফেটেরিয়া সংস্কারে ৩০ লাখ টাকা, পাইলিং রিটেইনিং ওয়ালসহ বাউন্ডারি নির্মাণে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা, অডিটরিয়াম নির্মাণে ১৫ কোটি টাকা, প্রশাসনিক ভবন সংস্কারে ২০ লাখ টাকা, চিকিৎসা কেন্দ্র নির্মাণে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, কলা ভবন-১ সংস্কারে ৪০ লাখ টাকা এবং শিক্ষক ডরমেটরি সংস্কারে ৩০ লাখ টাকা জরুরি প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কলেজের দর্শন বিভাগের ছাত্র আজমির হোসেনের অভিযোগ, সব থেকে শিক্ষার্থী বহুল ক্যাম্পাসটিতে সরজমিনে বুঝতে পারবেন কি দশা। বৃষ্টি হলে হাঁটু সমান পানি পাড় হয়ে ক্লাস বা পরীক্ষায় যেতে হয়। শিক্ষার্থীরা এই দুর্ভোগ বছরের পর বছর ধরে পোহালেও কোনো সমাধান নেই। কর্তৃপক্ষ যে প্রকল্প জমা দিয়েছে, সেটি অনুমোদন হলে আমাদের কোনো দুর্ভোগই থাকবে না।
বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী নুসরত জাহান পপির মতে, ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মাত্র একটি ক্যান্টিন। সেটিও বহুদিন ধরে বন্ধ। খাবারের জন্য অনেক দূর হেঁটে ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে হয়। তাতে সময় নষ্ট হয়, ভোগান্তিও হয়। ক্যান্টিনটি সংস্কারের জন্য অনেকবার বলেছি। কিন্তু কোনো সুরাহা হচ্ছে না।
মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্র মোসাদ্দেক হোসেনের ভাষ্য, শুনেছি ১৯২০ সালের দিকে ছাত্রাবাসটি চালু করা হয়। সেই থেকে ওই একই ভবনে সংস্কার ছাড়া থাকছেন ছাত্ররা। এর মধ্যে ভূমিকম্পে থাকা ফাটলগুলো অনেক বড় হয়েছে। তিনতলা এই ছাত্রাবাস যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। যেকোনো দুর্ঘটনা এমনকি ছাত্ররা মারাও যেতে পারে। কর্তৃপক্ষ নামমাত্র সংস্কার করে দায়মুক্ত হচ্ছেন। আমরা এর জন্য টানা আন্দোলনও করেছি।
বনমালী গাঙ্গুলী ছাত্রনিবাসের সানজিদা আক্তারের ভাষ্য, নতুন ভবন বাদে একটি ভবনের অবস্থাও ভালো না। আমরা জোর করে বাধ্য হয়ে এখানে থাকছি। শুনেছি নতুন প্রকল্পের আবেদন করা হয়েছে। আমরা চাই সেগুলো পাস হোক। তাহলে আমরা না পেলেও ভবিষ্যতে যারা আসবেন তারা পাবেন।
সরকারি ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ শেখ মো. তাজুল ইসলাম বললেন, শিক্ষার্থীর তুলনায় কলেজের অবকাঠামো ও আবাসিক হোস্টেলের সংখ্যা অপ্রতুল। অনেকগুলো ভবন পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ। পুরনো ভবনগুলোর পলেস্তরা খসে বিভিন্ন দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এই অবস্থায় পুরনো ভবনগুলো সংস্কার এবং নতুন ভবন নির্মাণ না করে কার্যক্রম চালানো দুরূহ ব্যাপার। শিক্ষা প্রকৌশল থেকে যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয় তা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় যথেষ্ট নয়। তাই বাধ্য হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হতে হয়েছে। তিনি দেশের স্বনামধন্য এই প্রতিষ্ঠানের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিলে সংকট নিরসন হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, পরিবহন সংকট নিরসনে দুটি বাসের আবেদন করা হয়েছে। কলেজের নিজস্ব আয়ের পরিবহন তহবিল থেকে ১ কোটি ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় দুটি বাস কেনা হবে। মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর বি এম আব্দুল হান্নান অনুমতির আবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে প্রেরণ করেছেন। বাস দুটি ক্রয় করা হলে শিক্ষার্থীদের পরিবহন সংকটের সমস্যা হ্রাস পাবে।




