মাহরীনের বীরত্বগাথা আজও ভোলেনি কেউ

মাহরীন চৌধুরী
ক্লাসে ছিল প্রাণচাঞ্চল্য, পড়াচ্ছিলেন বাংলা বিষয়ের শিক্ষিকা মাহরীন চৌধুরী (৪৬)। হঠাৎ এলোমেলো হয়ে গেল সব। বিকট শব্দে বিদ্যালয়ে আছড়ে পড়ল প্রশিক্ষণ বিমানটি। মুহূর্তের মধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে আগুনের লেলিহান শিখা আর বিষাক্ত কালো ধোঁয়া। ক্লাসরুমে তৈরি হয় চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা। আহতদের চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে মাইলস্টোনের আকাশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনার মুহূর্তে দ্রুত শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুম থেকে বের করে আনেন মাহরীন। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের বের করে নিজেই যথাসময়ে বের হতে পারেননি। দগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন ক্লাসরুমের ভেতরেই। ঘটনাস্থলে থাকা এক উদ্ধারকর্মী জানিয়েছিলেন, ‘শিক্ষিকার জন্য অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী বেঁচে গেছে।’
২০২৫ সালের ২১ জুলাই দুপুরের পর মাহরীনকে উদ্ধার করে পাঠানো হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। ওই রাতেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার। সেদিন বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন শাওন বিন রহমান জানিয়েছিলেন, শিক্ষিকা মাহরীনের শরীরের ১০০ শতাংশই দগ্ধ হয়েছিল।
উদ্ধার শিক্ষার্থীদের একজন নোমানের ভাষ্য, ‘ম্যাম আমাদের টেনে বের করে না আনলে হয়তো বেঁচে থাকতাম না। তিনি আমাদের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।’
মাহরীনের মৃত্যুর খবর আরও শোকাহত করে তোলে মাইলস্টোন পরিবারসহ দেশবাসীকে। তার মৃত্যুতে শোক জানায় তৎকালীন সরকারসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
পরদিন ২২ জুলাই বিকালে নীলফামারীর জলঢাকা পৌরসভার বগুলাগাড়ী গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে দাফন করা হয় তাকে। তিনি স্থানীয় মুহিত চৌধুরী ও ছাদেরা চৌধুরী দম্পতির কন্যা।
ওইদিন শোকে মুহ্যমান মাহরীন চৌধুরীর স্বামী মনসুর হেলাল জানান, শিক্ষাবিস্তারে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন তার স্ত্রী। নিজ গ্রামের বগুলাগাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজকে মাইলস্টোনের আদলে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পরিষদের সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ‘তার মৃত্যু আমাদের গভীর শোকের কারণ হলেও আমরা সে শোক কাটিয়ে উঠে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি’, যোগ করেন তিনি।
২১ জুলাইয়ের বিমান দুর্ঘটনার পর ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আইএসপিআর জানায়, আকস্মিক এই বিমান দুর্ঘটনায় বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামসহ ২০ জন নিহত ও ১৭১ জন আহত হয়েছিলেন। আহতদের মধ্যে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে আটজন, বার্ন ইনস্টিটিউটে ৭০ জন, ঢাকা সিএমএইচে ১৭ জন, কুর্মিটোলায় একজন, উত্তরার লুবনা জেনারেল হাসপাতাল ও কার্ডিয়াক সেন্টারে ১১ জন, উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে ৬০ জন এবং উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে একজন চিকিৎসা নেন।
পরে আহতদের মধ্যে আরও ১৬ জনের মৃত্যু হয়। এতে মোট মৃত্যু হয় ৩৬ জনের, যার মধ্যে ২৮ জনই ছিল শিক্ষার্থী।
বীরত্বের স্বীকৃতি
নিজের জীবন বিপন্ন করে শিক্ষার্থীদের উদ্ধারের স্বীকৃতিস্বরূপ মাহরীন চৌধুরীকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়েছে সরকার। সমাজসেবায় গৌরবোজ্জ্বল কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০২৬ সালে এ সম্মাননা পান তিনি।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভয়াবহ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। বিবৃতিতে শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারানো মাহরীন চৌধুরীর আত্মত্যাগের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
লিখেছিলেন, ‘এই মর্মান্তিক ঘটনার শিকারদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষক মাহরীন চৌধুরী। যিনি তার শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যান এবং পরে আরও শিক্ষার্থীকে বাঁচাতে সাহসিকতার সঙ্গে ধোঁয়া ও আগুনের মধ্যে ফিরে যান। তার অসীম সাহস ভোলা যাবে না।’







