জামিনে ফিরে ফের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখরাঙানি, আছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশ জুড়ে সাঁড়াশি অভিযান। প্রতিদিনই হাজারো গ্রেপ্তারের খবর। তবু টানা যাচ্ছে না অপরাধের লাগাম। পর্দার আড়ালের চিত্রপটটি বড়ই উদ্বেগজনক। অপরাধের চাকা ঘুরছে আগের মতোই। মাদক বা চোরাচালান, ছিনতাই বা ডাকাতি, চাঁদাবাজি থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড— নগর থেকে প্রত্যন্ত জনপদে একই চিত্র। পাশাপাশি বাড়ছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বা রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার।
একের পর এক অভিযানে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে সন্দেহভাজন ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের। কিন্তু বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তারের পরও অপরাধের বহুমাত্রিক বিস্তার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযানে গত ১ মে থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত ৮৮ দিনে সারা দেশে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৯৩ জনকে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৪৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ ছাড়া অন্যান্য মামলা ও অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৭২২ জন। বিশেষ অভিযান ও অন্যান্য মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৮৯ জন। যদিও এত এত অভিযান ও হাজারো গ্রেপ্তারের পরও কমছে না যেন অপরাধ।
সম্প্রতি মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় প্রতিটি মামলার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। একই সঙ্গে হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি ও অপহরণের মতো গুরুতর মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে নিষ্পত্তির ওপর করা হয়েছে গুরুত্বারোপ। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় মাদক ও চোরাকারবার। এই দুই শ্রেণিতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ২৮ হাজার ১১০ জন, যা মোট গ্রেপ্তারের প্রায় ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া প্রতি চারজনের মধ্যে প্রায় তিনজনই মাদক কারবার বা চোরাকারবারে জড়িত।
গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেশের অপরাধ পরিস্থিতির একটি ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপ বেশি, কোনো অঞ্চলে অপরাধ দমনে অভিযান বেশি হয়েছে, আবার কোনো কোনো এলাকা তুলনামূলক রয়েছে কম ঝুঁকিতে, তারও একটি ধারণা পাওয়া গেছে। রেঞ্জ ও মহানগর মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে ঢাকা রেঞ্জ ও ঢাকা মহানগর এলাকায়। কম গ্রেপ্তার সিলেট রেঞ্জে ও রংপুর মহানগর এলাকায়।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ দমনে অভিযান জরুরি হলেও এর পাশাপাশি অপরাধের উৎস, অর্থের জোগান, মাদকের উৎস ও সরবরাহের চেইন, চোরাচালানের রুট, অস্ত্রের উৎস এবং অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতার জায়গাগুলো শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। না হলে একদল গ্রেপ্তার হলেও তাদের জায়গা নিতে নতুন অপরাধী তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের গ্রেপ্তার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১ মে থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত ৮৮ দিনের হিসাবে মোট ৩৯ হাজার ২৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৪৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। অভিযানের এই পরিসংখ্যান একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক তৎপরতার চিত্র তুলে ধরে, অন্যদিকে মাদক, চোরাকারবার, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অপরাধের বিস্তৃত উপস্থিতিরও ইঙ্গিত দেয় বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইউনিটভিত্তিক তথ্যেও অপরাধের বিস্তারের একটি চিত্র পাওয়া যায়। রেঞ্জ ও মহানগর মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে ঢাকা রেঞ্জ ও ঢাকা মহানগর এলাকায়। বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার সবচেয়ে বেশি মাদক কারবারি ও চোরাকারবারি।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বললেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে শুধু গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে স্থায়ী ফল পাওয়া সম্ভব নয়। গ্রেপ্তার মূলত একটি সাময়িক বা কিউরেটিভ মেজার ব্যবস্থা। অথচ মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন প্রিভেন্টিভ মেজার বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। অর্থাৎ মাদকের মূল উৎস, সীমান্তবর্তী চ্যানেল ও পুরো সাপ্লাই চেইন বন্ধ করা। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সদিচ্ছা প্রয়োজন। কারণ মাদকের পেছনে বড় ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত।’
স্বার্থের বলয় ভাঙতে সরকার কতটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত, সেটিই মূল বিষয় বলে মনে করেন অধ্যাপক সাজ্জাদ। ‘মাদকের মূল সোর্স বা উৎসের জায়গায় হাত না দিয়ে শুধু শহরকেন্দ্রিক গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়ানো হলে তা অনেকটা জনতুষ্টির চেষ্টা হয়ে দাঁড়ায়। এতে অপরাধ দমনের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয় না।’
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান বলছিলেন, ‘বিশেষ অভিযান পরিচালনার সময় যাচাই-বাছাই ছাড়া নির্বিচারে গ্রেপ্তার কোনোভাবেই কাম্য নয়। একজন মাদকসেবী বা চোরাকারবারির পাশাপাশি নিরপরাধ ব্যক্তিও গ্রেপ্তার হতে পারেন, যা মানবাধিকারের দৃষ্টিতে অত্যন্ত অন্যায় এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এ ছাড়া বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রেপ্তার হলেও তাদের রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা আদালত ও কারাগারে নেই। ফলে সকালে আদালতে পাঠানো একজন আসামি বিকালেই জামিনে বেরিয়ে আসছে। এতে গ্রেপ্তার অভিযান অনেক ক্ষেত্রে একটি চক্রের মধ্যে আটকে যাচ্ছে, অপরাধের মূল উৎসে আঘাত করা যাচ্ছে না।’
অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই কাউকে গ্রেপ্তার করা উচিত বলে মনে করেন এই মানবাধিকারকর্মী। ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মানবাধিকারের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তুলতে হবে। এটি রাতারাতি তৈরি হয় না, প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হয়। নিয়োগের পর প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নিয়মিত স্টাডি সার্কেল, আলোচনা ও মানবাধিকার বিষয়ে চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন।




