আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস
রোহিঙ্গা দম্পতির ১১ সন্তান!

ছবি: আগামীর সময়
আগুনে পুড়ছিল গ্রামের পর গ্রাম। চারদিকে গুলির শব্দ, আতঙ্ক আর মৃত্যু। প্রাণ বাঁচাতে ২০১৭ সালের ২৮ আগস্ট গভীর রাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুচিডং শহরের নিকটবর্তী চেরাংপাড়া গ্রাম থেকে ৯ সন্তান সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে হাঁটা শুরু করেন ছৈয়দ আহমদ ও রাবেয়া খাতুন দম্পতি। সাত দিন পাহাড়, জঙ্গল ও নদী পেরিয়ে তারা পৌঁছান উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর রাবেয়া খাতুন আরও দুই সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। এখন তাদের সন্তানের সংখ্যা ১১। বর্তমানে এক নাতিসহ পরিবারের সদস্য ১৪ জন। এর মধ্যে শিশুই চারজন।
গত মঙ্গলবার দুপুরে কুতুপালং ক্যাম্প-৩-এর এফ-ব্লকের ১১০ বর্গফুটের ছোট্ট ঘরে বসে ছৈয়দ আহমদ বলেছেন, ‘মিয়ানমারে যখন ছিলাম তখন ৯ সন্তান ছিল। বাংলাদেশে আসার পর আরও দুই সন্তান হয়েছে। পরিবার বড় হয়েছে, কিন্তু খাদ্য সহায়তা কমেছে। নেই আয়ের সুযোগও। তাই এখন সংসার চালানো খুব কঠিন।’
ছৈয়দ আহমদের বড় ছেলে ওমর ফারুক (৩৫) দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। বিয়ে করলেও তার সন্তান নেই। দ্বিতীয় ছেলে মোহাম্মদ তৈয়ব (৩৩) দিনমজুরের কাজ করেন। কখনো ক্যাম্পের ভেতরে, কখনো বাইরে। তার পাঁচ মাস বয়সী শিশু রয়েছে। আরেক ছেলে মোহাম্মদ হারুন (৩০) সাগরপথে মালয়েশিয়ায় চলে গেছেন। মেয়েদের কেউ বিয়ে করে আলাদা সংসার গড়েছেন, কেউ পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন, আবার কেউ এখনো ক্যাম্পের শিক্ষাকেন্দ্রে পড়ছেন।
১৪ সদস্যের এই পরিবার মাসে ১৫৬ ডলার খাদ্য সহায়তা পায়। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার টাকা। কিন্তু পরিবারটির দাবি, এত বড় সংসারের জন্য এ সহায়তা যথেষ্ট নয়। মানবিক সহায়তা হিসেবে পাওয়া ১২ লিটারের গ্যাস সিলিন্ডারও পুরো মাস চলে না। শেষদিকে কাঠের লাকড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়।
শুধু ছৈয়দ আহমদের পরিবার নয়, পাশের ব্লকের বাসিন্দা জামাল হোসেন ও ছকিনা খাতুন দম্পতির গল্পও প্রায় একই। ২০১৭ সালে ৯ সন্তান নিয়ে বাংলাদেশে আসা পরিবারটিতে আরও তিন শিশুর জন্ম হয়েছে। পরিবারের সদস্যসংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু জীবনযুদ্ধও হয়েছে আরও কঠিন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে ধাত্রীদের মাধ্যমে হওয়া প্রসবের হিসাব যুক্ত করলে প্রতিদিন গড়ে ৭২ শিশুর জন্মের তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় তিনটি নতুন শিশুর জন্ম হচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। বছরে যুক্ত হচ্ছে প্রায় ২৬ হাজার নতুন মুখ।
রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) নতুন নীতিমালায় পরিবারভেদে মাথাপিছু খাদ্য সহায়তা ৭, ১০ ও ১২ ডলারে নির্ধারণ করেছে। আগে সবাই সমানভাবে ১২ ডলার পেতে।
সুস্থ-সবল কিশোর ও যুবকদের জন্য অনেক ক্ষেত্রে মাসিক খাদ্য সহায়তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭ ডলারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৫৯ টাকা। এই অর্থে এক মাসের খাদ্যচাহিদা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব বলে দাবি ক্যাম্পবাসীদের।
ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের সাবেক চিকিৎসক ডা. ওয়াসিফ কামাল নাদিম মনে করেন, ‘পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম থাকলেও বাস্তবে অনেক পরিবার এখনো বড় পরিবার গঠনের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।’
বিশ্ব শরণার্থী দিবসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— প্রতিদিন জন্ম নেওয়া নতুন শিশু মানে শুধু নতুন জীবন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের নতুন দায়।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মুর্শেদ চৌধুরী খোকার ভাষায়, ‘৯ বছর আগে মানবিক কারণে নির্যাতিত একটি জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সাময়িক আশ্রয় এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও জটিল দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী সংকটগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।’







