পুনর্মূল্যায়নে ব্যয় কমল ৬৯৭৪ কোটি টাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর যানজট নিরসনে নেওয়া হয়েছে নতুন আরেকটি মেট্রোরেল লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট)। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। পরে পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত দুটি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেশি ধরা হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। পরে পিইসির ব্যাপক চাপে মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৬ হাজার ৯৭৪ কোটি কমিয়ে ৪৭ হাজার ৬৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পরামর্শকের পকেটেই যাবে ১ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা।
এদিকে প্রকল্পটি অনুমোদনের আগেই কনস্ট্রাকশন ও সুপারভিশন পরামর্শক নিয়োগে নির্দিষ্ট কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার পাঁয়তারার অভিযোগ উঠেছে। বলা হয়েছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে একটি চক্রকে কাজ দিতে প্রচেষ্টা চালানো হয়। এ বিষয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছে একটি কোম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধি। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এ রকম অভিযোগের বিষয়টি আমি এখনো জানি না। আপনার মাধ্যমে জানলাম। বিষয়টি খতিয়ে দেখব। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রকল্প পরিচালক ব্রি. জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘প্রথম দিকে আমরা ধারণার ভিত্তিতে ব্যয় প্রাক্কলন করে ডিপিপি তৈরি করেছিলাম। পরে ২০২৪ সালে যখন ডিটেইল ডিজাইন তৈরি হয় তখন পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যয় স্টিমেট করায় মোট ব্যয় কমেছে।’ অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘ডিপিপি অনুমোদনের আগেই পরামর্শক নিয়োগের কাজটি এগিয়ে রেখেছি। এতে ৯ মাস সময় সাশ্রয় হয়। এমনটা অন্য প্রকল্পে করা না হলেও আমরা করেছি। শর্টলিস্ট থেকে তথ্য পেতে সাতবার সময় বাড়িয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, এখানে অনিয়ম বা দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ভাষ্য, ২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে এমআরটি লাইন-৫-এর ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) পাঠানো হয়েছিল। সেখানে মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা ছিল ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। সে সময় ১ মার্কিন ডলার সমান ১০৮ টাকা ৫৩ পয়সা ছিল। এই ব্যয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ধরেছিল বিভিন্ন অংশের গ্রস মূলধনি ব্যয়ের ভিত্তিতে। পরে দুটি পিইসি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে বিনিয়োগ প্রকল্পের ওপর প্রাক্কলিত ব্যয়ের যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করা হয়।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ বলেছেন, কোরিয়া সাধারণত কম বিনিয়োগ করে বেশি লাভ নিতে চায়। মেট্রোরেলে দেশটি সম্ভবত প্রথম অর্থায়ন করছে। ফলে তাদের প্রস্তাবিত অনেক িকছুই খতিয়ে দেখতে হবে। এ ধরনের প্রকল্পের অভিযোগ হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কেননা যারা অভিযোগ করেন তারা যুক্তি এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই করে থাকেন।
সূত্র জানায়, প্রকল্পটির আওতায় গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি ভায়া টেকনিক্যাল-কল্যাণপুর-শ্যামলী-কলেজগেট-আসাদগেট-শুক্রাবাদ-কারওয়ান বাজার-হাতিরঝিল-তেজগাঁও-আফতাবনগর-আফতাবনগর সেন্টার-আফতাবনগর পূর্ব (নাসিরাবাদ) পর্যন্ত ১৭ দশমিক ৪ কিলোমিটার লাইন নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে উড়াল ও পাতাল লাইন তৈরির মধ্য দিয়ে ঢাকা শহরের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তকে যুক্ত করা হবে।
সূত্রমতে, গত ১ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রকল্পটিতে পরামর্শক নিয়োগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের এজেন্ট মীর সাব্বির হোসেন। তার ভাষ্য, তৎকালীন আওয়ামী লীগের আমলে সরকারের আস্থাভাজন প্রভাবশালী আমলা, রাজনীতিবিদ এবং ভারতীয় এজেন্টের যোগসাজশে একটি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়। মূল্যায়নের ক্রাইটেরিয়াও এমনভাবে করা হয় যাতে আস্থাভাজনরাই কাজ পান। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই প্রকল্পে কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড সুপারভিশন পরামর্শক নিয়োগের জন্য ইওআইয়ের (এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট) জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এরপর কয়েক দফায় সময় বাড়িয়ে ছয়টি কোম্পানির শর্টলিস্ট করা হয়েছে। যেগুলোর সঙ্গে ভারতীয় কোম্পানির নাম যুক্ত আছে। এরপর প্রস্তাবনা সাবমিট করার জন্য ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই চিঠি জারি করা হয়। এর ডেডলাইন ছিল ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। অভিযোগকারীর ভাষ্য, কনস্ট্রাকশন ও সুপারভিশন পরামর্শক নিয়োগে এত তাড়াহুড়ো, আয়োজন ও আগ্রহ চক্রান্তের অংশ হতে পারে। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘অভিযোগের কোনো কপি আমার নজরে আসেনি। বিষয়টি জানার পর খতিয়ে দেখা হবে।’




