জুতা দিয়ে টেবিলে আঘাত থেকে সনদ ছেঁড়া, জাতিসংঘে স্মরণীয় ৬ মুহূর্ত

কোলাজ- আগামীর সময়/সংগ্রর
জুতা দিয়ে টেবিলে আঘাত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ভাষণ, জলপাই শাখা হাতে স্বাধীনতার আকুতি, এমনকি জাতিসংঘের সনদ ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে সাধারণ পরিষদের মঞ্চে। কখনো কোনো বিশ্বনেতার বিস্ফোরক বক্তব্য, কখনো নাটকীয় অঙ্গভঙ্গি, আবার কখনো সরাসরি প্রতিপক্ষকে আক্রমণ, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এমন বহু মুহূর্ত ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে।
নিউ ইয়র্কে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন বিশ্বনেতারা। এমন সময় বিশ্বরাজনীতি, যুদ্ধ, সংঘাত ও কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি অতীতের স্মরণীয় ঘটনাগুলোও ফিরে আসছে আলোচনায়।
ফিদেল কাস্ত্রোর দীর্ঘতম ভাষণ
১৯৬০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে ভাষণ দেন কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। এটি ছিল সাধারণ পরিষদে সময় ধরে রেকর্ড করা সবচেয়ে দীর্ঘ ভাষণ, যার দৈর্ঘ্য ছিল ৪ ঘণ্টা ২৯ মিনিট।
নিজের পরিচিত সবুজ সামরিক পোশাক পরে দেওয়া ভাষণে কাস্ত্রো বলেছিলেন, এর ২০ মাস আগে তার নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিপ্লব কিউবার ‘যুক্তরাষ্ট্রের একটি উপনিবেশ’ হিসেবে থাকার অবসান ঘটিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো মনে করে, ‘আমাদের দেশে নাশকতা চালানো ও তা উৎসাহিত করার অধিকার’ তাদের রয়েছে।দীর্ঘ ও বিক্ষিপ্ত ওই ভাষণে কাস্ত্রো সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কিউবার সম্পর্কের পক্ষে সাফাই দেন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘সাম্রাজ্যবাদী সরকার’ কিউবায় হামলা চালাতে পারে বলেও তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে তিনি ‘নিরক্ষর ও অজ্ঞ কোটিপতি’ বলেও আখ্যা দেন।
নিউ ইয়র্কে তার সঙ্গে ‘অবমাননাকর ও অপমানজনক আচরণ’ করা হচ্ছিল বলেও অভিযোগ করেন কাস্ত্রো। এর মধ্যে তাকে হোটেল থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ছিল।
ক্রুশ্চেভের জুতা দিয়ে টেবিলে আঘাত
১৯৬০ সালের ১২ অক্টোবর ঘটে আরেক নাটকীয় ঘটনা। ঔপনিবেশিকতাবাদ নিয়ে সাধারণ পরিষদের বিতর্ক চলাকালে তৎকালীন সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণাধীন পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর স্বাধীনতার অভাব নিয়ে ফিলিপাইনের প্রতিনিধির বক্তব্যের জবাব দেওয়ার অধিকার দাবি করেন।
ক্রুশ্চেভ দাঁড়িয়ে ক্ষুব্ধভাবে টেবিলে আঘাত করতে শুরু করেন। এরপর তিনি টেবিলের নিচে থাকা একটি জুতা তুলে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সেটি দিয়ে কয়েকবার টেবিলে আঘাত করেন।
ক্রুশ্চেভের নাতনি পরে লিখেছিলেন, তার পরনে থাকা নতুন জুতাগুলো আঁটসাঁট ছিল। তাই বসে থাকার সময় তিনি জুতা খুলে রেখেছিলেন। তার নাতনি ও দোভাষী জানান, ক্রুশ্চেভ দাঁড়িয়ে এত জোরে মুষ্টি দিয়ে টেবিলে আঘাত করেছিলেন যে তার হাতঘড়ি খুলে পড়ে যায়। ঘড়িটি তুলতে গিয়ে তিনি জুতাটি দেখতে পান এবং সেটি দিয়েই টেবিলে আঘাত করতে শুরু করেন।
আরাফাতের জলপাই শাখা নাকি বন্দুক
ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার (পিএলও) নেতা ইয়াসির আরাফাত ১৯৭৪ সালের ১৩ নভেম্বর প্রথমবারের মতো সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন। তিনি ছিলেন কোনো অসদস্য একটি সংস্থার প্রথম প্রতিনিধি, যিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন।
ফিলিস্তিনিদের ‘নিজেদের ভূখণ্ডে জাতীয় স্বাধীন-সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার’ সুযোগ করে দিতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।আরাফাতের বক্তব্যের সবচেয়ে স্মরণীয় অংশে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ আমি জলপাই শাখা ও একজন মুক্তিযোদ্ধার বন্দুক হাতে নিয়ে এসেছি। আমার হাত থেকে জলপাই শাখাটি পড়ে যেতে দেবেন না। আমি আবার বলছি, আমার হাত থেকে জলপাই শাখাটি পড়ে যেতে দেবেন না।’
ভাষণের পর পিএলও জাতিসংঘে পর্যবেক্ষকের মর্যাদা পায় এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকৃত হয়।
বুশকে ‘শয়তান’ বলেছিলেন শাভেজ
ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ ২০০৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে দেওয়া এক উত্তেজনাপূর্ণ ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে ‘শয়তান’ বলে আখ্যা দেন। নাটকীয় ভঙ্গিতে ক্রুশচিহ্ন আঁকার অঙ্গভঙ্গি করে তিনি অভিযোগ করেন, বুশ এমনভাবে কথা বলেন যেন ‘তিনি বিশ্বের মালিক’।
বামপন্থী এই নেতার ভাষণকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দেশগুলোর জোট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শাভেজের সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়েছিল।
এর আগের দিন সাধারণ পরিষদে বুশের দেওয়া ভাষণের প্রসঙ্গ টেনে শাভেজ বলেন, ‘গতকাল শয়তান এখানে এসেছিল।’
তিনি বুশকে ‘সাম্রাজ্যবাদের মুখপাত্র’ বলেও আখ্যা দেন। তার অভিযোগ ছিল, বুশ ‘বিশ্বের জনগণের ওপর আধিপত্য, শোষণ ও লুটপাটের বর্তমান কাঠামো টিকিয়ে রাখতে’ চাইছেন।
জাতিসংঘের সনদ ছিঁড়লেন গাদ্দাফি
লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ২০০৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ৪০ বছর পর প্রথমবারের মতো সাধারণ পরিষদের মঞ্চে ওঠেন। তিনি ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিটের একটি দীর্ঘ ও বিক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। এতে সাধারণ পরিষদের কক্ষের বড় একটি অংশ খালি হয়ে যায়।
ঢিলেঢালা বাদামি বেদুইন পোশাক ও কালো বেরেট পরা গাদ্দাফি কয়েক ডজন যুদ্ধ ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতিসংঘের সমালোচনা করেন। ইরাকে ‘গণহত্যা’র জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রস্তাব দেন এবং ইসলামি আমিরাত প্রতিষ্ঠার তালেবানের অধিকারকে সমর্থন করেন।
একপর্যায়ে গাদ্দাফি জাতিসংঘের সনদের একটি কপি তুলে ধরেন এবং তাকে সেটি ছিঁড়ে ফেলতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ওই নথির কর্তৃত্ব তিনি স্বীকার করেন না।
পরে সেদিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন সাধারণ পরিষদে বলেন, ‘আমি এখানে জাতিসংঘের সনদ পুনর্ব্যক্ত করতে দাঁড়িয়েছি, এটি ছিঁড়ে ফেলতে নয়।’
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নেতানিয়াহুর ‘রেড লাইন’
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার সময় একটি বড় কার্টুনধর্মী বোমার চিত্র তুলে ধরেন। বোমাটিকে ৭০ শতাংশ ও ৯০ শতাংশ—দুটি ভাগে বিভক্ত করে দেখানো হয়েছিল।
নেতানিয়াহু বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে ইরান ৭০ শতাংশ অগ্রসর হয়েছে। তিনি বিশ্বের প্রতি একটি স্পষ্ট ‘রেড লাইন’ টেনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার আহ্বান জানান।
২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার সময় একটি বড় কার্টুনধর্মী বোমার চিত্র তুলে ধরেন। এরপর তিনি ৯০ শতাংশের নিচে একটি লাল রেখা আঁকেন। তার দাবি ছিল, ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ইরান ওই পর্যায়ে পৌঁছে যাবে এবং তাদের সেখানে পৌঁছাতে দেওয়া উচিত নয়।
নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরানের চেয়ে আর কিছুই বিশ্বকে বেশি বিপদের মধ্যে ফেলতে পারে না।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘রেড লাইন’ যুদ্ধ ঠেকায়।
সূত্র : অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস









