আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস
বিশ্বের সর্বোচ্চ জনবসতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে, কিলোমিটারে ৬৪ হাজার মানুষ

সংগৃহীত ছবি
সকালের আলো ফুটতেই কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থীশিবিরে শুরু হয় হুড়োহুড়ি-দৌড়াদৌড়ি। সরু গলিপথ ধরে খাদ্য সংগ্রহে বের হন নারীরা, দলে দলে শিশুরা ছুটে লার্নিং সেন্টারে। আর পুরুষরা কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ান ক্যাম্পের ভেতরে কিংবা বাইরে। ৯ বছর ধরে এমন লক্ষ্যহীনভাবে কাটছে তাদের জীবন। কিন্তু এত দীর্ঘ সময়েও একটি প্রশ্নের উত্তর মেলেনি— কবে ফিরবেন তারা নিজের দেশ মিয়ানমারে?
বিশ্ব শরণার্থী দিবস সামনে রেখে আবারও আলোচনায় এসেছে রোহিঙ্গা সংকট। প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া, নিরাপত্তা ঝুঁকি, পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি এবং নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ-অনিশ্চয়তা গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের সংকট, নতুন করে বেড়েছে চাপ: বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় গ্রহণের ইতিহাস কয়েক দশকের পুরনো। ১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের ‘অপারেশন নাগামিন’-এ প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এরপর ১৯৯১-৯২ সালে আরও আড়াই লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে এপারে চলে আসে। তবে সবচেয়ে বড় ঢল নামে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর। রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে কয়েক মাসের মধ্যে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে ২০১৬ সালের শেষদিকে আরও প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছিল।
নতুন করে রাখাইনে ত্রিমুখী সংঘাত তীব্র হওয়ায় ২০২৪ সাল থেকে আরও প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য থেকে জানা যায়।
বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১১ লাখ ৯৪ হাজার। এর মধ্যে কক্সবাজারের ৩৩টি শিবিরে রয়েছে ১১ লাখ ৬০ হাজার ২৭৩ এবং ভাসানচরে ৩৩ হাজার ৮৫০ জন। এ ছাড়া অনিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা অন্তত তিন লাখ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী বসতি: উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবির বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী বসতিগুলোর একটি। মাত্র ২৩ দশমিক ৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বসবাস। প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে প্রায় ৬৪ হাজার মানুষের ঘনত্ব বিশ্বের সর্বোচ্চ জনঘনত্বপূর্ণ মানববসতিগুলোর অন্যতম। এর মধ্যে কুতুপালং-বালুখালী মেগা ক্যাম্প এককভাবে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থীশিবির হিসেবে পরিচিত। জনঘনত্বের এই হার বিশ্বের অধিকাংশ দেশ, শহর ও শরণার্থীশিবিরের তুলনায় অনেক বেশি।
তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় গড় জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১ হাজার ৩০০, সিঙ্গাপুরে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ ও বাহরাইনে প্রায় ২ হাজার ২০০ জন। বিশ্বের জনবহুল নগরী ঢাকা মহানগরে জনঘনত্ব ৩০ থেকে ৪৫ হাজার, ম্যানিলায় প্রায় ৪৩ হাজার, ম্যানহাটনে ২৮ হাজার এবং মুম্বাইয়ে প্রায় ২১ হাজার। সে হিসাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর জনঘনত্ব ঢাকার চেয়ে অনেক বেশি, ম্যানহাটনের আড়াইগুণের বেশি এবং মুম্বাইয়ের প্রায় তিনগুণ।
বিশ্বের বৃহৎ শরণার্থীশিবিরগুলোর মধ্যেও এমন ঘনবসতির নজিরও খুব কম। কেনিয়ার দাদাব, জর্ডানের জা’আতারি কিংবা উগান্ডার বিদিবিদি শরণার্থী বসতিতে জনঘনত্ব সাধারণত কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এত মানুষের বসবাস এটিকে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী আবাস এবং মানববসতিতে পরিণত করেছে।
জনমিতিক তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫২ শতাংশ নারী। মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি শিশু ও কিশোর। একটি পরিবারের গড় সদস্য সংখ্যা ছয়জনের বেশি।
প্রতি বছর জন্ম নিচ্ছে ৩০ হাজার শিশু: শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানালেন, ক্যাম্পে পরিচালিত প্রায় ১২০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম চললেও প্রতি বছর ২০ থেকে ৩০ হাজার নতুন শিশুর জন্ম হচ্ছে।
তার ভাষ্য, গত ৯ বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৫৬ শতাংশ থেকে কমে ২০ শতাংশে নেমে এলেও জনসংখ্যার চাপ এখনো ক্রমাগত বাড়ছে।
কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা: রোহিঙ্গারা প্রায় সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। আরআরআরসি জানায়, একজন রোহিঙ্গা প্রতিদিন যে খাদ্যসহায়তা পায়, তার প্রতিবেলার মূল্য গড়ে ১৬ টাকা।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বছরে প্রায় ১২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকার মানবিক সহায়তা ব্যয় করা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থায়নে সংকট দেখা দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট, সুদান ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণ ক্রমেই কমছে। এতে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং নারী-শিশু সুরক্ষা কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা মানবিক সংস্থাগুলোর।
বনভূমি হারিয়ে পরিবেশের ক্ষতি
রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত মূল্য দিতে হয়েছে কক্সবাজারের বনাঞ্চলকে। উখিয়া বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মোহাম্মদ শাহিনুর ইসলাম শাহীন জানালেন, ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা প্রবেশের পর উখিয়া ও টেকনাফের সংরক্ষিত বনভূমিতে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার একরের কাছাকাছি বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের ফলে উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের বন্য হাতির স্বাভাবিক চলাচলও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এ অঞ্চলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ হাতির করিডর রয়েছে। এর মধ্যে উখিয়া-ঘুমধুম করিডরের মাঝখানে তিনটি ক্যাম্প গড়ে ওঠায় হাতির স্বাভাবিক চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
পরিবেশবিদ হোসাইন সোহেলের মতে, ‘এটি দীর্ঘমেয়াদে জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে।’
নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে: রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এপিবিএনের ডিআইজি প্রলয় চিসিম জানালেন, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৯৯৯ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া উদ্ধার হয়েছে প্রায় এক কেজি হেরোইন, আড়াই কেজি আইস, ১৩০ কেজি গাঁজা এবং বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি মদ। এ সময় মাদকসংক্রান্ত ১ হাজার ৬৩৭টি মামলায় ২ হাজার ১১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
একই সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে ৫৩টি পিস্তল, চারটি রিভলভার, ৩৯৫টি দেশীয় অস্ত্র, ১২টি অ্যাসল্ট রাইফেল, ১৪টি হ্যান্ড গ্রেনেড এবং ৫ হাজার ২৩২ রাউন্ড গুলি। অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩৫৪ জন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২০২০ সাল থেকে চলতি বছর ৩১ মে পর্যন্ত ক্যাম্প এলাকায় ২৪৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৭৪টি এবং ২০২৪ সালে ৬২টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
জঙ্গিবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের আশঙ্কা: আরআরআরসি কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়িত, কর্মহীন ও শিক্ষাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করার ঝুঁকি থাকে। যদিও ক্যাম্পে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতির তথ্য তাদের কাছে নেই বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে ডিআইজি প্রলয় চিসিম বলেছেন, জঙ্গিবাদের উত্থানের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ধারাবাহিক আইনশৃঙ্খলা অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারির কারণে অপরাধের হার আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
৩৩টি ক্যাম্পের অধিকাংশ কাঁটাতারের বেড়ায় ছিদ্র করে রোহিঙ্গারা বাইরে যাতায়াত করে। বর্তমানে এমন প্রায় দেড় শতাধিক পয়েন্ট রয়েছে। তবে ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে তিনটি ব্যাটালিয়নের অধীনে ২২টি এপিবিএন ক্যাম্পের সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় লাখো মানুষ
বাংলাদেশ সরকার বারবার বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। কিন্তু একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি।
আরআরআরসি কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের ভাষ্য, ‘প্রত্যাবাসন নিয়ে বলার মতো কোনো অগ্রগতি নেই।’
রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকেও নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তার দাবি অব্যাহত রয়েছে।
প্রত্যাবাসনপন্থী রোহিঙ্গা নেতা নিহত মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহর প্রতিষ্ঠিত সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ)-এর চেয়ারম্যান মাস্টার জুবায়ের বললেন, ‘বছরের পর বছর ক্যাম্পে বসবাস করতে করতে আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছি। এই দীর্ঘ বন্দিজীবন থেকে মুক্তি চাই। আমরা সবাই শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদে নিজ দেশে ফিরতে চাই।’
বাংলাদেশের সামনে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ: রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক ইস্যু নয়; এটি পরিবেশ, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।
একদিকে হাজার হাজার একর বনভূমি হারিয়ে গেছে, সংকুচিত হয়েছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া অপরাধ ও অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘বিশ্ব শরণার্থী দিবসের প্রাক্কালে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— ৯ বছর পরও কি রোহিঙ্গারা শরণার্থী হিসেবেই থেকে যাবে, নাকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কার্যকর পথ তৈরি করে দেবে?’





