ফাঁসির সাজা টিকছে না চারটির ৩টিই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় হাইকোর্টে এসে উল্লেখযোগ্য হারে বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে সম্প্রতি গঠিত একটি বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চে নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজনই শেষ পর্যন্ত হয় খালাস পাচ্ছেন, নয়তো তাদের সাজা কমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপ নিচ্ছে।
চলতি বছরের ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করা বিশেষ ওই বেঞ্চে শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০টি ডেথ রেফারেন্স ও আপিল মামলা। এর মধ্যে একটি মামলা শিশু আইনের হওয়ায় তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। বাকি ১৯টির মধ্যে ১৪টির রায় ঘোষণা হয়েছে। এসব মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন ৩০ জন। কিন্তু হাইকোর্টে এসে তাদের মধ্যে মাত্র সাতজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। ১০ জন সম্পূর্ণ খালাস পেয়েছেন, আর ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে।
সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতনের কয়েকটি আলোচিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয় বিচার বিভাগ। এর অংশ হিসেবে গত ১০ জুন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজাকে নিয়ে একটি বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন করেন।
এই বেঞ্চে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে মামলা পরিচালনা করছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মোহাম্মদ ইমাম হোসেন তারেক। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, যেসব মামলায় আসামিরা খালাস পান, সেগুলোর প্রধান কারণ পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব। হত্যাকাণ্ড ঘটেছে— এটি প্রমাণিত হলেও কে হত্যাটি করেছে কিংবা ঘটনার সময় আসামির উপস্থিতি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা না গেলে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার সুযোগ থাকে না।
তার ভাষ্য, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধিকাংশ ডেথ রেফারেন্স মামলা যৌতুকের কারণে মৃত্যুর অভিযোগসংক্রান্ত। কিন্তু হাইকোর্টে শুনানির সময় প্রায়ই দেখা যায়, মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণিত হলেও যৌতুক দাবি এবং সেই দাবির কারণে নির্যাতনের অপরিহার্য উপাদান সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তখন আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের পরিবর্তে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় অপরাধটি বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ডকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করেন।
ব্যারিস্টার ইমাম হোসেন বলেছেন, অধিকাংশ মামলার তদন্তে বড় ধরনের দুর্বলতা থাকে। ডিএনএ পরীক্ষা, আঙুলের ছাপ কিংবা অন্যান্য বৈজ্ঞানিক আলামত সংগ্রহ করা হয় না। অনেক তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্তভাবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর নির্ভর করেন। অথচ শুধু জবানবন্দির ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা আইনের দৃষ্টিতে নিরাপদ নয়।
তিনি আরও বললেন, অনেক ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীদের সাক্ষী করা হয় না। পরিবর্তে আত্মীয়স্বজনকে সাক্ষী করা হলেও পরে তাদের অনেকে আদালতে সাক্ষ্য দিতে অনাগ্রহী হন কিংবা বৈরী সাক্ষীতে পরিণত হন। এতে রাষ্ট্রপক্ষের মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের মতে, নিম্ন আদালত অনেক সময় ঘটনার বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিলেও হাইকোর্টে প্রতিটি মামলায় স্বীকারোক্তির গ্রহণযোগ্যতা, সাক্ষ্যের নির্ভরযোগ্যতা, আইনি সুরক্ষা এবং পূর্ববর্তী নজির গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়। ফলে তদন্ত বা প্রসিকিউশনের দুর্বলতা স্পষ্ট হলে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বললেন, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপক্ষকে আসামির অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয়। ন্যূনতম যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকলেও কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় না। তাই শক্তিশালী তদন্ত, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ এবং নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ এই বেঞ্চে মামলা পরিচালনার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের নেতৃত্বে একটি বিশেষ আইনজীবী টিমও গঠন করা হয়েছে। এতে রয়েছেন কয়েকজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল।
সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ আগামীর সময়কে বলেছেন, বাংলাদেশে ফৌজদারি অপরাধের মূল বিচার হয় নিম্ন আদালতে। কিন্তু সম্প্রতি সেখানে দ্রুততার সঙ্গে (ফাস্ট ট্র্যাকে) বিচার করা হচ্ছে। অল্পদিনের মধ্যে ফল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ফলে বিচারে ভুলত্রুটি থাকছে। তাই উচ্চ আদালতে এসে এগুলো খালাস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়।
তার ভাষায়, ‘আপনি যখন বিচার দ্রুত করবেন, বিচার হারিড (hurried) হবে, তখন ন্যায়বিচার বারির (buried) হয়ে যাবে। এটি তো আমাদের জুরিসপ্রুডেন্সে কথা আছেই।’
মনজিল মোরশেদের মতে, আলোচিত বা স্পর্শকাতর মামলাগুলোয় গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রচারের কারণে সরকারের ওপর দ্রুত বিচার শেষ করার চাপ তৈরি হয়। এক্ষেত্রে বিচার দ্রুত শেষ করার প্রবণতা দেখা যায়। এতে বিচার যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেছেন, মৃত্যুদণ্ডের মামলার ক্ষেত্রে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রতিটি বিষয় খতিয়ে দেখেন। কারণ, একটি রায়ের মাধ্যমে একজন মানুষের জীবন-মৃত্যুর বিষয় জড়িত থাকে। তাই বিচারকরা প্রমাণ ও আইনের প্রতিটি দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন। আপিল বিভাগে গেলে মামলাটি আরও বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হয়। কোথাও যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকলে আসামিকে খালাস দেওয়া হয় অথবা সাজা কমিয়ে দেওয়া হয়। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি।




