মিয়ানমার নিয়ে কেমন হওয়া উচিত আমাদের পররাষ্ট্রনীতি

কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ড্রোন ভিউ- রয়টার্স
গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী মিয়ানমার নিয়ে বেশি করে ভাবার ও আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু মানবিক সমস্যাই নয়। দুই দেশই একে নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। মিয়ানমার জান্তা ও আরাকান আর্মির দ্বৈরথ বাধ্য করছে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নিবিড় ভাবে ভাবার। এই পরিস্থিতিতে কেমন হওয়া উচিত আমাদের পররাষ্ট্রনীতি? এক্ষেত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে এখন আমাদের সূক্ষ্মভাবে ভাবতে হবে।
প্রথমত, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোন কেন্দ্রিক হওয়া উচিত। আরাকান আর্মি নাকি জান্তা? বিষয়টি পরিষ্কার বুঝতে হলে দুই শক্তির দ্বৈরথ সম্পর্কে জানা জরুরি। আরাকান আর্মির ‘লড়তে লড়তে গড়ো, গড়তে গড়তে লড়ো’ মতবাদ থেকে সামরিকভাবে নিজেদের বিস্তার ঘটানো এবং একই সঙ্গে দখলকৃত অঞ্চলগুলো শাসন করার মনোভাব স্পষ্ট। সেইসঙ্গে তাদের ‘রাখিতা’ মতবাদ বুঝাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ‘আরাকান ড্রিম’ ঘোষণার পর আলোচনায় আসে মতবাদটি।
আরাকানি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি লুকিয়ে আছে ‘রাখিতা’ ধারণার মধ্যে। রাখিতা শব্দ দিয়ে সেই সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়, যার ছিল নিজস্ব ঐতিহ্য, নীতিনৈতিকতা, মূল্যবোধ ও বংশমর্যাদা। যা বজায় ছিল ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত। সেই হারানো গৌরব, সমৃদ্ধি, মর্যাদা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ফেরাতে চায় ‘আরাকানি জাতীয়তাবাদ’।
এই আরাকানি জাতীয়তাবাদের মধ্যে স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী মাত্র সাতটি। রাখাইন, কামেইন, খুমি, দাইংনেত, মারমাগ্রী, ম্রো এবং থেত। এর মধ্যে রোহিঙ্গা বা মুসলিমদের কোনো স্বীকৃতি নেই। রোহিঙ্গারা রাখাইন অঞ্চলের পুরোনো মুসলিম জনগোষ্ঠী হলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করেনি। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের পর তারা কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার দায়িত্ব বহন করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। কক্সবাজারে ক্যাম্পগুলো ঘনবসতিপূর্ণ, খাদ্য সহায়তা কমছে, দারিদ্র্য বাড়ছে, অপরাধ, মাদক, মানবপাচার, গ্যাং সহিংসতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও চাপ পড়েছে। পানি সংকট, মজুরি কমে যাওয়া, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার চাপ এবং সামাজিক উত্তেজনা বেড়েছে। পরিবেশগত ক্ষতিও বড় সমস্যা। বন ধ্বংস, পাহাড় কাটা, জ্বালানি কাঠ ব্যবহার ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে।
তাই বাংলাদেশকে এখন মাল্টি লেভেল ডিপ্লোম্যাসির কথা ভাবতে হবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের কথা রয়েছে। ছয় দিনের এই সফরে প্রথমে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও পরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন সরকার প্রধান। এই সফরে হয়ত আলোচনা হতে পারে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান, মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য কেমন হবে এসব নিয়ে। আশা থাকবে আঞ্চলিক ও জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী যেন তুলে ধরতে পারেন। পাশাপাশি নেপিদো ও বেইজিংয়ের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে নীতি নিতে পারেন। যেহেতু জান্তা সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতায় সেক্ষত্রে তাদের পাশে রাখার বিকল্প নেই। আবার আরাকান আর্মির সঙ্গে ব্যাক ডোর চ্যানেলেও যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।









