আরাকান আর্মির মতবাদের আড়ালে রাখাইন রাজ্যের রাজনীতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সম্প্রতি মিয়ানমারের রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন দৃশ্যমান। গত নির্বাচনে বিতর্কিত জয়ের পর জান্তার তথাকথিত রূপান্তরের মাধ্যমে এই পরিবর্তন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানান মিন অং হ্লাইং। সাবেক এই জান্তাপ্রধানই ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মূল কারিগর।
এদিকে মিয়ানমারে জান্তার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী আরাকান আর্মি। তারা নিজেদের ১৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের সময় ‘লড়তে লড়তে গড়ো, গড়তে গড়তে লড়ো’— দ্বিমুখী প্রতিশ্রুতির কথা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এমন দ্বৈত কৌশলের মানে হলো সামরিকভাবে নিজেদের বিস্তার ঘটানো। একই সঙ্গে দখলকৃত অঞ্চলগুলো শাসন করা।
আরাকানি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি নিহিত রাখিতা ধারণার মধ্যে। রাখিতা শব্দ দিয়ে সেই সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়, যার ছিল নিজস্ব ঐতিহ্য, নীতিনৈতিকতা, মূল্যবোধ ও বংশমর্যাদা
এমন নীতির পর থেকেই গুঞ্জন ছড়াতে শুরু করে আরাকান আর্মির রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে। তাদের লক্ষ্য আসলে কি? স্বায়ত্তশাসন, ফেডারেল কাঠামো নাকি অন্য কিছু। এই সংকটের কারণে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে দ্বিধায় পড়েছে প্রতিবেশীরা। বিশেষ করে যাদের সঙ্গে রয়েছে মিয়ানমারের সীমান্ত এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। দেশগুলোর রাজনীতি ও কূটনীতিতেও রয়েছে রাখাইন রাজ্যের কৌশলগত প্রভাব। তবে আরাকান আর্মির ইশতেহার গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে তাদের রাজনৈতিক কৌশল বোঝা সম্ভব।
আরাকান আর্মির ‘রাখিতা’ মতবাদ চারটি আদর্শিক নীতির ভিত্তিতে গঠিত। জাতীয়তাবাদ, সামরিকবাদ, ঐতিহাসিক সংশোধনবাদ এবং বাস্তবতাবাদ। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ‘আরাকান ড্রিম’ ঘোষণার পর আলোচনায় আসে মতবাদটি। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাখাইন জয় করার প্রত্যয়ে এই নীতি ধারণ করে আসছে আরাকান আর্মি।
প্রথমত, আরাকানি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি নিহিত ‘রাখিতা’ ধারণার মধ্যে। রাখিতা শব্দ দিয়ে সেই সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়, যার ছিল নিজস্ব ঐতিহ্য, নীতিনৈতিকতা, মূল্যবোধ ও বংশমর্যাদা। ১৭৮৪ সালে বার্মার কোনবাউং রাজবংশ দ্বারা অবরুদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত রাজ্যটির মর্যাদা অক্ষুণ্ণ ছিল।
পরে ব্রিটিশ এবং জাপানি আগ্রাসনের সময়েও এই রাজ্যকে চরম ‘লাঞ্ছনা’ সহ্য করতে হয়। মূলত সেই হারানো গৌরব, সমৃদ্ধি, মর্যাদা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ফেরাতে চায় ‘আরাকানি জাতীয়তাবাদ’। ঔপনিবেশিক শাসনের আগের সময়ে আরাকান ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ অঞ্চল। চীন এবং ইউরোপের বেশির ভাগ বাণিজ্য জাহাজের যাতায়াত পথ হওয়ায় সে সময় সিত্তওয়ে (আকিয়াব) ছিল আমদানি-রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
১৯৪২ সালের বার্মা অভিযানের পর জাপানের দখলে চলে যায় আরাকান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে আরাকানিরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়লেও ১৯৪৫ সালের শুরুর দিকে তারা মিত্রশক্তির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে
দ্বিতীয়ত, আরাকান রাজ্যে বহিঃশত্রুর আগ্রাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইশতেহারে শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে আরাকান আর্মি। এমনকি তাদের ইশতেহারে মাতৃভূমির ওপর আসা যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিরোধকেও বৈধতা দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার জান্তার আগ্রাসনও এর মধ্যে আছে। আর তাই মাত্র ২৭ জন নিয়ে যাত্রা শুরু করা আরাকান আর্মি আজ প্রায় ৫ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী।
তৃতীয়ত, জাতিগত সংহতি বা ঐক্য বজায় রাখার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘ঐতিহাসিক সংশোধনবাদ’। অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের সময় আরাকানিরা হয়তো আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন পাওয়ার আশায় লড়েছিল দুই পক্ষের হয়ে। কিন্তু ব্রিটিশরা শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসলে তাদের প্রতি সমর্থন ও পরে ব্রিটিশ বার্মায় যোগ দেয় আরাকানিরা। তবে খুব দ্রুতই ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তারা। কারণ আরাকান রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার কোনো ইচ্ছাই ব্রিটিশদের ছিল না।
১৯৪২ সালের বার্মা অভিযানের পর জাপানের দখলে চলে যায় আরাকান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে আরাকানিরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়লেও ১৯৪৫ সালের শুরুর দিকে তারা মিত্রশক্তির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে তারা। সে কারণে অতীতের রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তগুলো সংশোধন করতে চায় আরাকান আর্মি। নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ঐক্যবদ্ধ থাকার নীতিতে বিশ্বাসী তারা।
প্রাচীন আরাকান রাজ্যে স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী ছিল সাতটি। যাদের বলা হয় আরাকানি। রাখাইন, কামেইন, খুমি, দাইংনেত, মারমাগ্রী, ম্রো এবং থেত। ইশতেহার অনুযায়ী পুরনো পরিচয় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হলে রোহিঙ্গা মুসলিমদের আবারও বাদ দেওয়া হবে
চতুর্থত, রাখিতা নীতি বাস্তবসম্মত বা প্রাগম্যাটিক পদক্ষেপকে উৎসাহিত করে। এই নীতি মূলত স্বাধীনতা, বৈধতা এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য কৌশলগত পদক্ষেপের ওপর জোর দেয়। এই নীতির সঙ্গে ‘প্রোটো-স্টেট’ বা উপরাষ্ট্র গঠনের মিল পাওয়া যায়। কারণ এ ধরনের ব্যবস্থার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রে থাকে স্থানীয় জাতিগোষ্ঠী। যার নির্দিষ্ট মাত্রায় থাকে স্বায়ত্তশাসন। আর এই ব্যবস্থায় বিদ্রোহীদের প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয় মানুষের। এ কারণে জান্তা সরকারের বদলে বিদ্রোহী প্রশাসনের দিকে এখন জনগণের আনুগত্য।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ‘আরাকান পিপলস অথরিটি’ গঠনের পর প্রতিফলন ঘটে বাস্তবতাবাদের। এই কর্তৃপক্ষের অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা এবং বিচারিক ম্যান্ডেট রয়েছে। জান্তা প্রশাসনের পাশাপাশি এটি সমান্তরালে কাজ করে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই ‘রাখিতা নীতি’ কি আসলেই কোনো গুরুত্ব বহন করে? ভবিষ্যতে হয়তো কাঙ্ক্ষিত আরাকান রাষ্ট্র গঠন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরাকান আর্মির রাজনৈতিক আচরণের পথপ্রদর্শক হবে মতবাদটি।
প্রাচীন ম্রাউক ইউ সাম্রাজ্যের রাজসভায় সভাসদদের মুসলিম উপাধি (ডাকনাম) ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও কেউই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি। তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীই ছিলেন
প্রশ্ন আসতে পারে— এই নীতির কারণে কী আরাকানিদের মধ্যে ‘জাতীয়তাবাদের শ্রেষ্ঠত্ববোধ’ জেগে উঠছে? আপাতদৃষ্টিতে এর উত্তর হলো, হ্যাঁ। প্রাচীন আরাকান রাজ্যে স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী ছিল সাতটি। যাদের বলা হয় আরাকানি। রাখাইন, কামেইন, খুমি, দাইংনেত, মারমাগ্রী, ম্রো এবং থেত। এর মধ্যে মুসলিমরা অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
আরাকান আর্মির ইশতেহার অনুযায়ী যদি পুরনো পরিচয় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলে, সেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের আবারও বাদ দেওয়া হবে। কিংবা সেই প্রচেষ্টা সব সময় থাকবে।
প্রাচীন ম্রাউক ইউ সাম্রাজ্যের রাজসভায় সভাসদদের মাঝে মুসলিম উপাধি (ডাকনাম) ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও কেউই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি। তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীই ছিলেন। তাছাড়া আরাকান আর্মি ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করতে দ্বিধাবোধ করে। কিছু ক্ষেত্রে তাদের ‘রাখাইন রাজ্যের মুসলিম বাসিন্দা’ বলতে পছন্দ করে। রোহিঙ্গা সংকট জান্তার তৈরি রাজনৈতিক সমস্যা— এমনটা বোঝাতেই এ কৌশল।
ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে জান্তার একটি ছায়াযুদ্ধের কৌশল এটি। প্রকৃতপক্ষে জান্তা ও আরাকান আর্মির সংঘাতের রেষ রোহিঙ্গাদের বইতে হবে দীর্ঘ সময়
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধেও সহিংসতার ইতিহাস রয়েছে আরাকান আর্মির। ফলে আলোচিত আরসার মতো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জান্তার পক্ষে লড়াই করার অভিযোগ পাওয়া যায়। এমনকি নাগরিকত্বের আশ্বাসে রোহিঙ্গাদের বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতেও নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। মূলত ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে জান্তার একটি ছায়াযুদ্ধের কৌশল এটি। প্রকৃতপক্ষে জান্তা ও আরাকান আর্মির সংঘাতের রেষ রোহিঙ্গাদের বইতে হবে দীর্ঘ সময়। ইশতেহার অনুযায়ী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তাজনিত হুমকির আখ্যা দিয়ে সহিংসতা চালাতে পারে আরাকান আর্মি।
প্রশ্ন ওঠে আরাকানি জাতীয়তাবাদ বৃহত্তর বার্মিজ জাতীয়তাবাদের (যা জান্তা ধারণ করে) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে কি না। কারণ এই দুই ধরনের জাতীয়তাবাদের মধ্যে ঐতিহাসিক শত্রুতা রয়েছে
আরাকান আর্মি আসলে স্বায়ত্তশাসন, শিথিল ফেডারেল কাঠামো নাকি পূর্ণ স্বাধীনতা চায়— তা এখনো স্পষ্ট নয়। তারা এখনো রাজনৈতিক দোদুল্যমানতার চক্রে বন্দি। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে আরাকান আর্মিপ্রধানের যুক্তি ছিল ঐতিহাসিকভাবে ফেডারেলিজমই উপযুক্ত। বিপরীতে স্বাধীনতার প্রশ্নে তারা অবলম্বন করেছে নমনীয় কৌশল। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে স্বাধীনতা পাওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করলেও সামরিক নিয়ন্ত্রণ অর্জনের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
আরাকান আর্মি ভবিষ্যতে সামরিক নিয়ন্ত্রণকে স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তর করবে কি না— এ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এ ছাড়া যদি কনফেডারেশনও হয়, তবে প্রশ্ন ওঠে আরাকানি জাতীয়তাবাদ বৃহত্তর বার্মিজ জাতীয়তাবাদের (যা জান্তা ধারণ করে) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে কি না। কারণ এই দুই ধরনের জাতীয়তাবাদের মধ্যে ঐতিহাসিক শত্রুতা রয়েছে।
পরিশেষে, আরাকান আর্মির নীতি এবং বাস্তব রাজনৈতিক বক্তব্যের অসঙ্গতি ‘রোহিঙ্গা পরিচয়’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তৈরি করছে বিভ্রান্তি। যার কারণে রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া হতে পারে আরও জটিল। দ্বিধায় ভরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কারণে ভবিষ্যতে জান্তা সরকার এবং আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা আরও কঠিন হবে প্রতিবেশীদের। এরই মধ্যে কাঁধে রোহিঙ্গা সংকট বইতে থাকা বাংলাদেশের জন্য তা হবে আরও বন্ধুর।
লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক। বর্তমানে তিনি কমনওয়েলথ স্কলার হিসেবে কিং’স কলেজ লন্ডনের ওয়ার স্টাডিজ বিভাগে স্নাতকোত্তরে (মাস্টার্স) অধ্যয়নরত




