দেশে যখন বন্যা এলো

তিন বছর আগে
মুখ পুরো হাঁ করে একবার শ্বাস নিলেন দেবেন্দ্র বর্মন। হাপরের মতো ওঠানামা করছে তার বুক। পাশে দাঁড়ানো কৃষ্ণা বর্মন স্বামীর সেই বুক ওঠানামা দেখতে পেলেন না; কিন্তু বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা। ধড়ফড় করছে যে তার বুকটাও, আটকে আসা নিঃশ্বাসে কাতর হয়ে আছেন যে তিনিও!
দেবেন্দ্র বর্মন আর কৃষ্ণা বর্মন দাঁড়িয়ে আছেন বুকপানিতে। আগের রাতে হাঁটু অবধি পানি ছিল। বৈশাখে এবারের আগাম বৃষ্টি আর বন্যায় সব ফসল ডুবে যেতে যেতে যতটুকু তুলতে পেরেছিলেন ঘরে; রেখেছিলেন বাঁশের মাচায়, মাটির ঘড়ায়, চৌকির কোনায়। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় তাদের, জেগে ওঠেন তারা। ততক্ষণে চৌকি ছুঁইয়ে যাচ্ছে পানি, একটু পর আরও উঁচু হলো, চৌকি বাইতে লাগল, আরও বাড়ল; ডুবে গেল চৌকি, মাচা, মাটির ঘড়া; ডুবে গেল তিন মাসের খাবার, ন্যূনতম বেঁচে থাকার অপরিমিত খোরাক। ডুবে গেল তাদের সবটুকু। আশি শতাংশ ডুবেছিল মাঠের পানিতে; ঘরে আনা বিশ শতাংশ ডুবে গেল বানের পানিতে!
ঘরে সামান্য সে জায়গাটুকুও নেই, যেখানে কয় দিন আগে শুকিয়ে রাখা চালগুলো রাখবেন। অগত্যা মাটির ঘড়াটা চৌকিতে তুললেন, তার ওপর অ্যালুমিনিয়ামের বড় পাত্রটা। পালা করে ডুব দিচ্ছেন তারা পানিতে, ভিজে ভারী হয়ে যাওয়া চালভর্তি পাটের বস্তা তোলা যায় না; শুধু মুঠো মুঠো করে, একটু একটু ভেজা চাল তুলে ওই ঘড়ার পাত্রে রাখেন। বুক চেপে আসে তাদের পানিতে, তার চেয়েও বড় আতঙ্ক— তিন বছরের ছেলেটা, বসে আছে, প্লাস্টিকের একটা গামলায়, এই বুঝি ভেসে যায়, এই বুঝি হারিয়ে যায় চোখের আড়ালে, যেমন গাই গরুটার চার মাস বয়সী বাছুরটা ভেসে গেছে গতকাল। তারপর থেকে সারা রাত, হাম্বা হাম্বা। সব কান্নার শব্দই বেদনার, বুক হাহাকারের— তা মানুষের কিংবা ছলছল নীরব চেয়ে থাকা অবোধ পশুর!
সুনামগঞ্জের নবগঠিত মধ্যনগর উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের সাড়ারকোনা গ্রামের দেবেন্দ্র বর্মন আর কৃষ্ণা বর্মনের কাহিনি আপাতত এটুকুই। হাওরে মাছ মেরে আর অল্প কিছু জমির ফসলে জীবন বাহিত করা ওই দম্পতির মতো হাজারো দম্পতির কাহিনিও একই। তবে সুখের কথা হচ্ছে, ‘বন্যা মোকাবিলায় সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।’ সরকারের তখনকার নেতা-মন্ত্রীরা এসব কথা বলেছিলেন। কিন্তু বেদনার কথা হচ্ছে, এরকম কথা আমরা আগেও শুনেছি। তারপরও জীবনানন্দের শিশির-শব্দের মতো নয়, মহা শব্দে মহা সমারোহে বন্যা আসে আমাদের দেশে, মাঝেমাঝেই প্রকাণ্ড আগুনে ছেয়ে যায় দালান-মানুষ-আকাশ, ব্যাংক খালি হয়ে যায় প্রতিনিয়ত-প্রতি বছর, দেখা মেলে মূল্যস্ফীতির, তিন বেলা থেকে দু বেলা খাওয়ার অভ্যস্ততার প্রস্তুতি নেয় মানুষ!
এ বছর
শাহিদা, উম্মে নেজাতুল, উম্মে সালমা, ওমাইচা বিবি, আর রাশিদার পাহাড় ডিঙানোর স্বপ্ন ছিল না সম্ভবত, কখনোই। কিন্তু ১২-১৩ বছরের এই মেয়েগুলো পাহাড় ঘেঁষেই ছিল, ছিল পাহাড়ের কোলে ঠাঁই নেওয়া তাদের বিদ্যা শেখার কক্ষে। আর একটু পর ছুটি। হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে পাহাড় ধসে পড়ল সেই কক্ষের ওপর, তাদের ওপর। চার ঘণ্টা পর তারা বের হয়ে এলো, বের করে আনা হলো প্রাণহীন দেহে!
পাহাড় ডিঙানোর স্বপ্ন তো দূরের কথা, পাহাড়ে চাপা পড়ল তাদের সবকিছু— জীবন, জীবনের সব আয়োজন, চাওয়া-পাওয়ার নিরন্তর লেনদেন।
চিঠি লেখার ঠিকানা চাই
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর জনপ্রিয় একটা গান আছে— ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো...।
মানুষ কখন আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখে— যখন কোনো ঠিকানা থাকে না তার। এখন আর কেউ চিঠি লেখে না-প্রশ্ন করে সবাই, সম্মুখ প্রশ্ন। কিন্তু আমাদেরও কেউ নেই যে যাকে আমরা প্রশ্ন করব। রুদ্রের মতো আমরা তাই অগত্যা আকাশকেই প্রশ্ন করি—
কেন বারবার আমাদের শহরগুলো ডুবে যায়-বৃষ্টিতে ঢাকা, চট্টগ্রাম; পানিতে হাওরের ফসল? ধসে পড়ে পাহাড়? বন্যা হয় সেই পানিতে?
- কারা সারা বছর পাহাড় কাটে?
- পাহাড়ের কোলে যারা বাস করে: কারা এরা, কারা বাস করে? কতটুকু আশ্রয়হীন এই ঠুনকো জীবন?
- এই বিপজ্জনক জায়গা থেকে তাদের দূরে রাখার দায়িত্ব কাদের? তারা কতটুকু দায়িত্ব পালন করছে?
- দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি আসলে কী, দুর্যোগ-পরবর্তী ব্যবস্থাইবা আসলে কী? মান্না দের গানের মতো, বড় জানতে ইচ্ছে করে।
- সবচেয়ে বড় কথা— জবাবদিহি কোথায়? এবার পপসম্রাট আজম খান হয়ে যাই আমরা— আলাল ক-ই-ই, দুলাল ক-ই-ই, নাইরে নাইরে নাইরে নাই...।
- শেষ প্রশ্ন— ডুবছে কেন আমার মা-বোন-ভাই, ডুবছে কেন ফসল-মাঠ-ঘাট-জমি, ডুবছে কেন প্রিয় দেশ? ধসছে কেন পাহাড়?
ঘুম আসে ঘুম
নিমতলীর আগুনের পর আমাদের দেশে আরও আগুন লেগেছে কয়েক জায়গায়। তাজরীন কিংবা রানা প্লাজার পর শ্রমিকের আত্মাহুতি হয়েছে আরও বহুবার। শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে গাড়িচাপায় মর্মান্তিকভাবে মেরে ফেলার পর মৃত্যু হয়েছে আরও অনেক শিক্ষার্থীর। শেয়ারবাজারে ফতুর করা পাবলিককে ফুটো থালা হাতে ধরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে শুভংকরের ফাঁদে। লঞ্চডুবিতে ডুবে যাওয়া যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় প্রতি বছরই। গালভরা বুলি আর অপরিণত চাপার আধিক্যে আপাত মগ্ন আমরা ভুলে যাই সবকিছু।
বন্যা এসেছে, বন্যা আবার আসবে; ফসল ডুবেছে, ফসল আবার ডুববে; মানুষ সব হারাচ্ছে, মানুষ আবারও নিঃস্ব হবে। আর আমাদের যাদের সাধ্য আছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শব্দ নিরোধক রুমের প্লাজমা টিভির সামনে বসব, ভুনা মাংসের খিচুড়ি খাবো আর রবীন্দ্রনাথের কবিতা শুনব— নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে/ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।
কী দরকার বাইরে বের হওয়ার, ওইসব ডুবে যাওয়া মানুষ দেখতে যাওয়ার— মধ্য আয়ের দেশের আয়েশে ঘুম এসে যায়, ঘু-উ-উ-ম...।
তারপর একদিন
বিশিষ্ট অংকন শিল্পী রনবী একটা প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন ‘বিচিত্রা’য়, ১৩ মে, ১৯৮৩ সালে। প্রচ্ছদের বাম পাশে-চুরুট মুখে কোট-টাই-কালো জুতো আর চশমা চোখের এক ভদ্রলোক, সামনে ছেঁড়া গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরিহিত এক আম পাবলিক। ১৯৮৩ সাল।
প্রচ্ছদের ডান পাশে ওই চুরুট মুখের ব্যক্তিটা আরও বড় হয়েছেন, বেড়ে গেছে তার স্বাস্থ্য-ভুঁড়ি-গালের মাংস; সামনে দাঁড়ানো ওই আম পাবলিকটাও আছেন, ছোট হয়ে গেছেন তিনি— খালি পা, খালি গা, হাঁটুর ওপরে ওঠা লুঙ্গি, পেটে গর্ত, শরীরের সব হাড় গোনা যায় তার সহজেই। ২০০০ সাল।
তারপর?
তারপর মানসিকভাবে মানুষ মরতে শুরু করেছে সেই কবেই—অনিরাপত্তায়, বিচারহীনতায়, অর্থকষ্ট আর বেঁচে থাকতে চাওয়ার যন্ত্রণায়। আগুন, বন্যা, মহামারীতে বেড়েছে শারীরিক মৃত্যু। এখন দিনে অথবা সপ্তাহে দু-একটা লাশ ভেসে যায় কোনো কোনো নদীতে; নীরবে, চোখের আড়ালে। একদিন হয়তো স্তূপ হবে। জমা হবে সেই লাশ, উপচে পড়বে নিথর দেহ। ভেঙে যাবে আমাদের গর্বিত আচরণ, চূর্ণ হবে দাম্ভিকতার সমস্ত মহড়া, ফুত করে উড়ে যাবে সব অর্জন!
বৃষ্টি হবে সেদিনও, বন্যাও। আগের চেয়ে প্রবল, আগের চেয়েও প্রকাণ্ড। বানের জল পশু চেনে না, বাড়ি চেনে না, চেনে না মসজিদ-মন্দির-পাপী-পুণ্যবান, চেনে না ক্ষমতাবান-অক্ষমতাবানও। তার কাছে সব খড়-কুটো। অন্ধ প্রলয়ের মতো নির্বিচারে ডুবিয়ে দেবে সবাইকে নিজের ভেতর, মিশিয়ে দেবে চিরতরে!
দেখার কেউ থাকবে না সেদিন, কেউ পার পাবে না সেই পাপমোচনে; কেবল মাথার ওপরের আদিগন্ত ধূসর আকাশ-থমকে থাকবে অনেকক্ষণ; স্তব্ধ, মৌন আর ব্যথাতুর রবে নীল হয়ে!




