ভূরাজনীতির পঞ্চপাণ্ডব ও বাংলাদেশ

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এক অত্যন্ত জটিল ও আকর্ষণীয় মোড় নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে আমেরিকা, ভারত এবং চীনের মধ্যে একধরনের টানাপড়েন দৃশ্যমান ছিল। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণে পাকিস্তান এবং তুরস্কের মতো দেশগুলোর সক্রিয়তা এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এই নতুন শক্তির আগমন কি আগের ত্রিমুখী সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলবে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো সমীকরণ কাজ করছে?
অনেকেই ভাবেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চীন ও ভারতের দ্বন্দ্বই প্রধান। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন। গত ১০ বছরে বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে চীনের অবস্থান এতটাই শক্তিশালী হয়েছে যে, তারা এখন আমেরিকার সমকক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফলে ঐতিহ্যগত ‘চীন বনাম ভারত’ কাঠামোটি এখন আর ততটা প্রভাবশালী নেই। ভারত নিজেই এখন চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের নতুন বিন্যাস খুঁজছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আসার পর এ সমীকরণ আরও স্পষ্ট হয়েছে। ব্রিকসে একসঙ্গে কাজ করা, ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ, ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানির মতো বড় বড় বিষয়ে ভারত ও চীনকে একই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এমনকি ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদারও এখন চীন।
তাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রাজনীতিতে মূল দ্বৈরথটি আসলে ভারত-চীনের নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে বাংলাদেশে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় ভূমিকা দেখেছি। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়েও নানা আলোচনা ও সমালোচনা এখনো চলছে। তবে এ পুরো প্রক্রিয়ায় চীন কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবে না। বেইজিং এখন পর্যবেক্ষণ করছে, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া এসব শর্ত বা চুক্তিকে কীভাবে ডিল করে। চীন বড় কোনো বিনিয়োগের আগে ঢাকার রাজনৈতিক অবস্থানের স্পষ্টতা চাইবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বহু সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হলেও, ‘এমওইউ সই করা’ আর ‘বিনিয়োগ বাস্তবায়ন করা’ এক জিনিস নয়। বাংলাদেশ এখন চীনকে সঙ্গে নিয়ে অর্থনৈতিকভাবে কত দূর এগোবে এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে বোঝাবে— তা মূলত ঢাকার নিজস্ব নীতিগত দক্ষতার ওপর নির্ভর করছে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব বা বিদেশে সম্পদ গড়ার মানসিকতা নিয়ে এই পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে দরকষাকষি করা অসম্ভব, কারণ তারা শুরুতেই আমাদের দুর্বলতা ধরে ফেলবে
ভূরাজনীতির এই মারপ্যাঁচে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা-সংকট। একসময় মনে করা হতো, এ অঞ্চলে ভারত ও চীন সমানে সমানে লড়ছে; কিন্তু অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কাঠামোর দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, ভারত এই দৌড়ে চীনের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমারে চীনের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং বিশাল প্রভাবের কারণে সমীকরণটি সম্পূর্ণ বেইজিংয়ের অনুকূলে।
মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা-সংকট সমাধানে বাংলাদেশের এখন একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী দরকার। ভারত যেখানে এ ইস্যুতে বা মিয়ানমারকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে নিজের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে, সেখানে চীন একাই বড় অনুঘটক হতে পারে। ভারতের মিডিয়া বা আমাদের দেশের টক শোতে যতই ‘চীন-ভারত’ দ্বন্দ্বের জিকির তোলা হোক না কেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং মিয়ানমার সীমান্ত সুরক্ষায় বেইজিংয়ের ভূমিকাই এখানে মুখ্য, ঢাকাকে তা বাস্তবসম্মতভাবেই ব্যবহার করতে হবে।
ভূরাজনীতিতে আরেকটি বড় উপাদান হলো, চীনের সঙ্গে আসিয়ানভুক্ত (ASEAN) দেশগুলোর বিশাল অর্থনৈতিক সম্পর্ক, যার বাণিজ্যের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। লাওস, থাইল্যান্ড কিংবা মালয়েশিয়ার সঙ্গে চীনের হাইস্পিড রেলওয়ে কানেকটিভিটি পুরো অঞ্চলের চিত্র বদলে দিচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর’ বাংলাদেশের জন্য আসিয়ান বাজারের প্রবেশদ্বার হতে পারে।
বর্তমানে চীন থেকে সমুদ্রপথে পণ্য আসতে যদি দুই সপ্তাহ সময় লাগে, এই করিডর সচল হলে স্থলপথে (মিয়ানমার হয়ে) তা মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব। এটি আমাদের আমদানি খরচ ও সময় নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেবে। তবে এই সুযোগ লুফে নেওয়ার আগে আমাদের গভীর গবেষণা প্রয়োজন। কারণ, পশ্চিমা বিশ্ব, তাদের অর্থায়নে চলা এনজিও এবং তাদের ঘরানার অর্থনীতিবিদরা স্বাভাবিকভাবেই এই করিডরের সমালোচনা করবেন। কিন্তু আমাদের দেখতে হবে, বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণের লাভ কোথায়। এই করিডর সফল হলে আসিয়ানের সদস্যপদের জন্য বাংলাদেশকে আর বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না; বরং আসিয়ান নিজেই বাংলাদেশকে যুক্ত করতে আগ্রহী হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ (আইএসপি) এবং চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বিআরআই মূলত একটি অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত কাঠামোর বিনিয়োগ, যার সঙ্গে নিরাপত্তার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি মূলত একটি নিরাপত্তাকেন্দ্রিক কাঠামো।
বাংলাদেশকে এখানে খুব সতর্কভাবে পথ চলতে হবে। আমরা যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে একপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তিতে জড়িয়ে পড়ি, তবে অন্য পরাশক্তিগুলো আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। তাই বাংলাদেশের উচিত একটি ‘নেট সিকিউরিটি রিসিভার’ বা নিরাপত্তার নিরপেক্ষ গ্রহীতা হওয়া— যেমনটি সিঙ্গাপুর বা জিবুতি করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রকে যদি কোনো কৌশলগত সুবিধা দিতেই হয়– সমপরিমাণ সুবিধা বা ভারসাম্য চীন, জাপান ও রাশিয়ার জন্যও উন্মুক্ত রাখতে হবে। এতে একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি কমবে। আর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে রাজনীতির মোহে পড়ে কোনো অবকাঠামো তৈরি না করে, বিনিয়োগের আর্থিক রিটার্ন বা মুনাফার হিসাবটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক বাড়ছে, যা ইতিবাচক। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু বিদেশি অস্ত্র বা প্রযুক্তির ওপর ভর করে কোনো দেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের সংকট থেকে বড় শিক্ষা হলো, আসল শক্তি আসে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে। ইরান আজ মার্কিন ও ইসরায়েলি চাপের মুখেও টিকে আছে। কারণ তারা নিজেদের শিক্ষা ও প্রকৌশল খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। বিশ্বে মাথাপিছু প্রকৌশলী এবং নারী বিজ্ঞানীর সংখ্যায় ইরান অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছে। সুতরাং তুরস্কের প্রযুক্তিকে আমাদের নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে লাগাতে হবে, তাদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার জন্য নয়।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের যে আলোচনা টক শো বা সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়, তা দিনশেষে ব্যবসার খতিয়ান ছাড়া টিকবে না। ১৯৭৫ সালের পরও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের জোর চেষ্টা হয়েছিল; কিন্তু তা বেশি দূর এগোয়নি— কারণ ব্যবসায়ীরা সেখানে কোনো স্থায়ী মুনাফা দেখতে পাননি। বর্তমানে দুদেশের বাণিজ্য ১ বিলিয়ন ডলারও নয়। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে পরিবহন খরচও একটি বড় বিষয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা তৃতীয় কোনো দেশকে (যেমন ভারতকে) বার্তা দেওয়ার জন্য সাময়িক সম্পর্ক তৈরি করা যায়; কিন্তু দিনশেষে কোনো ব্যবসায়ী লোকসান করে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখবে না।
আন্তর্জাতিক মহলের এই ‘পঞ্চপাণ্ডব’ বা পাঁচ পরাশক্তির (আমেরিকা, চীন, ভারত, রাশিয়া, তুরস্ক) চাপের মুখে বাংলাদেশ ঝুঁকিতে পড়বে কি না, তা নির্ভর করছে আমাদের নীতিনির্ধারকদের পেশাদারিত্বের ওপর। পৃথিবীর বহু দেশই এ সব কটি শক্তির সঙ্গে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রেখে নিজেদের ব্যবসা সচল রাখছে। এটি সম্পূর্ণভাবে পেশাদার কূটনীতির বিষয়।
ঝুঁকি তখনই সৃষ্টি হয়, যখন আমাদের নীতিনির্ধারকদের ‘এক পা বাংলাদেশে আরেক পা বিদেশে’ থাকে। দ্বৈত নাগরিকত্ব বা বিদেশে সম্পদ গড়ার মানসিকতা নিয়ে এই পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে দরকষাকষি করা অসম্ভব, কারণ তারা শুরুতেই আমাদের দুর্বলতা ধরে ফেলবে। সিঙ্গাপুর, ভারত বা ইরানের মতো দেশের নেতারা এক পাসপোর্ট এবং এক দেশের নীতিতে অটল থাকেন। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদেরও দুই পা শক্তভাবে বাংলাদেশের মাটিতেই রাখতে হবে, মনস্তাত্ত্বিকভাবে ‘প্রথম বাংলাদেশ’ নীতি ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অন্য কোথাও পালিয়ে যাচ্ছে না, তারা এ মাটিতেই আছে এবং দেশের স্বার্থে রাজপথে নেমে ত্যাগ স্বীকার করছে। দেশের পলিসিমেকাররা যদি এই সাধারণ জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখতে পারেন, তবে কোনো বিদেশি শক্তির চাপই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারবে না। ক্ষমতার মূল উৎস যেহেতু জনগণ, তাই জনগণের স্বার্থকে কেন্দ্রে রেখেই আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সাজাতে হবে।
লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ঢাবি; আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ





