সম্পাদকীয়
ভাসছে দেশ ডুবছে মানবিকতা

প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে মানুষ কতটা অসহায়, তা আবারও প্রমাণ করছে দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতি। সিলেট থেকে চট্টগ্রাম, বান্দরবান থেকে বেনাপোল; কিংবা খোদ রাজধানী ঢাকা— সর্বত্রই এখন থইথই পানির বিস্তার। বিরামহীন বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে লাখ লাখ মানুষ যখন পানিবন্দি, একটুকরো শুকনো খাবার বা একঢোক বিশুদ্ধ পানির জন্য যখন হাহাকার চলছে, তখন আমাদের চেনা রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক চরিত্রগুলো আবারও তাদের পুরনো খোলস নিয়ে হাজির হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর যেখানে আগেই টানা বর্ষণ, ঢল ও পাহাড়ধসের স্পষ্ট পূর্বাভাস দিয়েছিল, সেখানে প্রশাসনিক ও স্থানীয় সরকারের চরম উদাসীনতা আমাদের স্তম্ভিত করে। কেন আগে থেকে সতর্কাবস্থা নেওয়া হলো না? কেন প্রস্তুত রাখা হলো না উদ্ধারকারী দল? এমনকি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ট্যুরিস্টরা আটকে পড়ার পরও প্রশাসনের ঘুম ভাঙেনি। এই কাঠামোগত ব্যর্থতা শুধু অবহেলা নয়, স্পষ্ট অপরাধ।
একদিকে পানিতে ডুবে মরছে শিশু, বসতভিটা হারিয়ে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছেন, অন্যদিকে তখন চলছে সস্তা দায় এড়ানোর আইনি চাতুরী। চট্টগ্রাম বন্দরের মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলে দেয়, দুর্যোগে পণ্য নষ্ট হলে তারা কোনো দায় নেবে না— কারণ এটি ‘অ্যাক্ট অব গড’ বা দৈবদুর্বিপাক! বছরের পর বছর হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করা একটি প্রতিষ্ঠান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ন্যূনতম পরিকাঠামো না বানিয়ে প্রকৃতির ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চায়, যা চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ। একই চিত্র বেনাপোল বন্দরে কিংবা রাজধানীর জলমগ্ন অলিগলিতে, যেখানে সামান্য বৃষ্টিতেই স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন অথচ বছরের পর বছর ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কারের ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুধু মানুষের ভোট কেনা হয়েছে।
অতীতে যেকোনো বন্যায় দুর্গত ব্যক্তিদের সাহায্যে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া, দলে দলে ত্রাণবাহী টিমের ছুটে যাওয়ার যে চেনা দৃশ্য ছিল, এবার তা যেন উধাও। বন্যা বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের ভোগান্তি ও প্রাণ যেখানে চরম হুমকির মুখে পড়ে, সেখানে বিগত সরকারগুলোর সময় আমরা এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি। দুর্যোগের এ কঠিন ক্ষণটিকেও একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী মহল রাজনৈতিক ফায়দা তোলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সহায়তার নামে দলগুলোর চটুল কার্যক্রম দুর্গত মানুষের ভোগান্তিকে লাঘব করার চেয়ে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এক প্যাকেট মুড়ি দেওয়ার জন্য যেভাবে ভুখা-নাঙ্গা মানুষদের লাইন করিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করানো হয়, তা মানুষের আত্মসম্মানে চরম আঘাত হানে। যেখানে দুর্যোগসংকুল মানুষ নয়, ত্রাণ বিতরণ ও তার রাজনীতিই মুখ্য হয়ে ওঠে। এবারও তেমন কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মিডিয়ার মনোযোগ আকর্ষণ করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার এ প্রতিযোগিতা এবং সরকারি ত্রাণের হরিলুট বন্ধ হওয়া দরকার।
আশা করি, বর্তমান সরকার, রাজনৈতিক দলগুলো এবং বিরোধী শক্তিগুলো অতীতের সেই কলঙ্কিত অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি এবার আর করবে না। মানুষের এই চরম বিপন্নতার দিনে দলমত, ক্ষমতা বা প্রচারের ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ ও সমন্বিতভাবে দুর্গত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানো আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বিচ্ছিন্নভাবে লোকদেখানো ফটোসেশনের রাজনীতি না করে সব শক্তিকে একত্র করে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃতি হয়তো তার নিজস্ব নিয়মে একসময় শান্ত হবে, পানিও নেমে যাবে; কিন্তু এ মানবিক সংকটে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো মানুষের পাশে দাঁড়াতে কতটা আন্তরিক ছিল, ইতিহাসের পাতায় তার হিসাব ঠিকই থেকে যাবে।




